বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬

ইরানে ট্রাম্পের হামলার হুমকি: বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকির কঠিন সমীকরণ

পাঠক প্রিয়

সুফি সাগর সামস্

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিলেও বাস্তবে সেই হুমকি কার্যকর করা যে কতটা কঠিন—তা স্পষ্ট করে তুলেছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এমন কোনও সহজ বা কার্যকর সামরিক বিকল্প নেই, যা বিক্ষোভকারীদের সরাসরি সহায়তা করতে পারে কিংবা শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে সক্ষম।

প্রস্তুতির ঘাটতি ও সামরিক বাস্তবতা

ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর পতনের পর ট্রাম্প প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস বাড়লেও ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি সীমিত। গত কয়েক মাসে অঞ্চলটিতে মার্কিন সেনা ও রণতরীর উপস্থিতি বরং কমানো হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল হামলার পর প্রায় দুই বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে টানা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন থাকলেও এখন সেই চিত্র বদলেছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ক্যারিবীয় অঞ্চলে এবং ইউএসএস নিমিৎজ যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে অবস্থান করছে। ফলে ইরানে হামলা চালাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে কাতার, বাহরাইন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান কিংবা সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে হবে—যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেও ইরানের পাল্টা আঘাতের ঝুঁকিতে ফেলবে।

বিমান হামলার সীমাবদ্ধতা

ট্রাম্পের সামনে আরেকটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে দূরপাল্লার বি-২ বোমারু বিমানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা—যেমনটি গত জুনে ইরানের ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় চালানো হয়েছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন হামলা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

যদিও গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের আঘাতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হয়েছে, তবুও তেহরানের হাতে এখনও প্রায় দুই হাজার ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। পাহাড়ের ভেতরে লুকানো উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলো নতুন করে পুনর্গঠন করা হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম।

লক্ষ্য নির্ধারণের জটিলতা

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র আসলে কোথায় আঘাত হানবে? ইরানে বিক্ষোভ ও দমন-পীড়ন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ায় সুনির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণ প্রায় অসম্ভব। ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হলে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি ঘটতে পারে, যা রাজনৈতিক পরিবর্তন তো আনবেই না, বরং আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও দুর্বল করবে।

হামলাই কি সরকারকে শক্ত করবে?

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনও সামরিক হামলাকে ইরানি সরকার জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিতে ব্যবহার করতে পারে। ১৯৫৩ সালে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতার দীর্ঘ ইতিহাস এই প্রচারণাকে আরও শক্তিশালী করবে। গত জুনে ইসরায়েলের বড় ধরনের হামলার পরও ইরানি সরকার ভেঙে না পড়া এই বাস্তবতারই প্রমাণ।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক রোক্সান ফারমানফারমায়ান বলেন, “ইরানে এখনও একটি সুসংগঠিত সরকার, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে, যা যেকোনও মূল্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রস্তুত।”

খামেনিকে লক্ষ্য করা হলে কী হবে?

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরাসরি লক্ষ্য করে হামলার কথাও আলোচনায় এলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাছাড়া খামেনি মারা গেলেও সরকার পরিবর্তনের কোনও নিশ্চয়তা নেই—কারণ তার উত্তরসূরির তালিকাও প্রস্তুত রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসরায়েল গত জুনে ইরানের অন্তত ৩০ জন শীর্ষ সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে হত্যা করলেও শাসনব্যবস্থা অটুট ছিল। ফলে সীমিত মার্কিন হামলায় সরকার ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

সাইবার হামলা: শেষ ভরসা?

বিকল্প হিসেবে সাইবার হামলার কথাও আলোচনায় রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বা যোগাযোগব্যবস্থায় আঘাত হানলে তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে সাধারণ মানুষ। এমনকি ইরানে ইন্টারনেট পুনরুদ্ধার বা তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগও বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘সহায়তা আসছে’ ধরনের বক্তব্যের বিপরীতে বাস্তবতা হলো—ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। বিপরীতে, এই ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক যুদ্ধ, ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় ও বৈশ্বিক অস্থিরতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।

সর্বশেষ সংবাদ

‘সার্ভিস’ শব্দের বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু কী মানুষের মুক্তি ঘটেছে?

সুফি সাগর সামস্ ভাষা, ক্ষমতা ও মানবমর্যাদা নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা সভ্যতার ইতিহাসে শব্দ কখনো কেবল শব্দ নয়; তারা একটি যুগের সামাজিক...

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ, জরুরি সংবাদ সম্মেলন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, শুক্রবার: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন জাতীয় সংসদের...

মানবমস্তিষ্ক: মহাবিশ্বের ভেতর আরেক মহাবিশ্ব

সুফি সাগর সামস্ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি কি কোনো নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা কৃষ্ণগহ্বর? হয়তো নয়। হয়তো সবচেয়ে বিস্ময়কর কাঠামো হলো মানবমস্তিষ্ক—কারণ এই ক্ষুদ্র জৈবিক অঙ্গই সমগ্র মহাবিশ্বকে...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেলে স্বাধীনতার মূল্যবোধও হারাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা না গেলে একসময় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধও হারিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ...

এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না : ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে...

জনপ্রিয় সংবাদ