বিশেষ প্রতিবেদন

দেশজুড়ে দ্রুত বাড়ছে হাম-এর সংক্রমণ। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা, একই সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটছে মৃত্যুর ঘটনা। রাজধানী ঢাকাসহ রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। হাসপাতালগুলো রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে; অনেক ক্ষেত্রে শয্যার সংকট পেরিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে করিডর ও বারান্দায়।
সংক্রমণ ছড়িয়েছে সারা দেশে, আক্রান্ত ছাড়িয়েছে ১,৫০০
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে হামের সংক্রমণ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, ইতোমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ১,৫০০ ছাড়িয়েছে এবং বসন্তকালীন এই সংক্রমণ আরও অন্তত দুই মাস স্থায়ী হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে—নয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে, যারা এখনো নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আসেনি। ফলে টিকা পাওয়ার আগেই তারা ঝুঁকিতে পড়ছে।
মৃত্যুর মিছিল: রাজশাহী ও ময়মনসিংহে শিশুদের মৃত্যু
গত শনিবার রাজশাহীতে তিন শিশু এবং ময়মনসিংহে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া:
- রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত তিন মাসে হাম ও নিউমোনিয়ায় ৬৩ শিশুর মৃত্যু
- ১১ দিনে ভেন্টিলেটর সংকটে ৩৩ শিশুর মৃত্যু
- রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে অন্তত এক শিশুর মৃত্যু
এছাড়া সারাদেশে শতাধিক শিশুমৃত্যুর অভিযোগ সামনে এসেছে, যা নিয়ে সরকারিভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
হাসপাতালগুলোতে ভয়াবহ চাপ
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ১০০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ১৩০ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। অতিরিক্ত রোগীদের মেঝে, করিডর ও বারান্দায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শিশু হাসপাতাল ও বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
টিকা সংকট ও কর্মসূচি ব্যাহত: প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:
- সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-তে বিঘ্ন
- টিকার সরবরাহ ঘাটতি
- মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আন্দোলন
- নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে দীর্ঘ বিরতি
বিশেষজ্ঞ ড. নিজাম উদ্দিন জানান, গত এক বছরে টিকাদান কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বহু শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
সরকারের জরুরি পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেওয়া হচ্ছে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ:
- আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি
- পূর্বে টিকা নেওয়া শিশুদের অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা
- টিকা না পাওয়া শিশুদের দ্রুত আওতায় আনা
- ৬০৪ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ অনুমোদন
- টিকা সংগ্রহ শেষে সারা দেশে ক্যাম্পেইন চালানোর প্রস্তুতি
একই সঙ্গে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে ৪টি ভেন্টিলেটর পাঠানো হচ্ছে এবং আরও ১২টি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ: দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
তারেক রহমান শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি দুই মন্ত্রীকে সারা দেশ ঘুরে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না করা হলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে। অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে—শিশুর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ, পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ এবং কার্যকর মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন ছাড়া এই সংকট নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


