
বিশেষ প্রতিবেদক : ঢাকা, ২১ নভেম্বর (২০২৫) ক্যানসার আক্রান্ত ময়মনসিংহের ত্রিশালের সায়েরা বেগম (৫৫) চিকিৎসার জন্য জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসলেও পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় এমআরআই সেবা। মেয়ে রুমানা (৩৫) অসহায় কণ্ঠে বললেন, “মায়ের ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসা খরচই সামলাতে পারছি না। এখন এমআরআই করাতে হবে বাইরে গিয়ে—যেখানে কয়েক গুণ বেশি টাকা লাগে। আমাদের পক্ষে তা সম্ভব না।”
পাঁচ বছর ধরে বন্ধ এমআরআই মেশিন
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একমাত্র এমআরআই মেশিনটি নষ্ট হয়ে আছে প্রায় পাঁচ বছর। চীন থেকে উপহার পাওয়া এই যন্ত্রটির মেরামত না হওয়ায় হাজারো রোগীকে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ক্যানসার রোগীদের সঠিক ও সময়মতো চিকিৎসা নির্ভর করে এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ওপর, কিন্তু মেশিনটি অকেজো থাকায় রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হচ্ছে এবং অনেক রোগীর অবস্থার আরও অবনতি ঘটছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, কিছুদিন আগেই নষ্ট হয়েছিল সিটিস্ক্যান মেশিন। তা মেরামত হলেও ফিল্ম সংকটের কারণে পরীক্ষার সংখ্যা সীমিত। ফলে রোগীদের টেস্টের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
ঢামেকেও একই চিত্র
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের একমাত্র এমআরআই মেশিনটিও একইভাবে বিকল হয়ে পড়ে আছে। ফলে হাসপাতালের গুরুতর অবস্থায় ভর্তি রোগীদেরকেও বাইরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালে এমআরআই করানোর খরচ ২,৫০০–৩,৫০০ টাকা হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এর খরচ ৬,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা। ফলে নিম্ন আয়ের রোগীদের ওপর বাড়ছে বাড়তি চাপ।
ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা জনি হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কম খরচে এমআরআই করাতে এসে দুইবার ফিরে গেছি। এখন বাইরে গিয়ে দ্বিগুণ টাকায় করাতে হবে।”
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, মেশিনটি মেরামতের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। “মেরামত ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় অন্য হাসপাতালের অকেজো মেশিন থেকে প্রয়োজনীয় অংশ এনে দ্রুত সচল করার চেষ্টা চলছে,” বলেন তিনি।
অন্যান্য হাসপাতালেও একই সংকট
ঢাকার বাইরেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়।
-
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে প্রায় ১১ কোটি টাকার ল্যাসিক মেশিন এক দশক ধরে অকেজো।
-
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট–এ বেশ কিছু আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্র বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।
-
বরিশাল, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে নষ্ট যন্ত্র পড়ে আছে বছরের পর বছর।
-
রাজশাহীতে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালই দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত।
বেসরকারি খাতে রোগীদের চাপ বাড়ছে
সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা না হওয়ায় বাধ্য হয়ে রোগীরা যাচ্ছেন বেসরকারি ডায়াগনস্টিকে—যেখানে খরচ কয়েকগুণ বেশি। সাধারণ মানুষের জন্য যা প্রায় অসহনীয়।
এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে; বিলম্বে রোগ শনাক্ত হওয়ায় রোগীরা গুরুতর হয়ে উঠছেন; এবং সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা খাতে তৈরি হচ্ছে অকার্যকারিতা ও আর্থিক বৈষম্য।
স্বাস্থ্যখাতে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন
সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আধুনিক যন্ত্রপাতি—যার ওপর চিকিৎসার মান নির্ভর করে। কিন্তু বছর বছর ধরে নষ্ট যন্ত্র পড়ে থাকা এবং সেগুলো মেরামতে দীর্ঘসূত্রতা স্বাস্থ্যসেবার প্রতি জনগণের আস্থাকে নড়বড়ে করছে।
রোগীরা বলছেন, শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ করলেই হবে না—প্রয়োজন সেবা নিশ্চিত করা এবং যন্ত্রপাতির দ্রুত মেরামত।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি পর্যায়ে যন্ত্র মেরামত, প্রতিস্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।


