বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬

রাজনীতির নতুন বাঁক: প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে শীর্ষে তারেক রহমান, বলছে দ্য ইকোনমিস্ট

পাঠক প্রিয়

বিশেষ প্রতিবেদক

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাপ্তাহিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট তাদের সর্বশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আগামী নির্বাচনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শীর্ষ দাবিদার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাময়িকীটি উল্লেখ করে, “খ্যাতনামা এক রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান ৬০ বছর বয়সী মি. রহমান ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রার্থী।”

‘বিপ্লব’-পরবর্তী প্রথম নির্বাচন

দ্য ইকোনমিস্ট এই নির্বাচনকে অভিহিত করেছে ১৮ মাস আগে সংঘটিত এক ‘বিপ্লব’-এর পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচন হিসেবে। সাময়িকীটির ভাষায়, ‘জেনারেশন জেড’-এর নেতৃত্বে সংঘটিত ওই আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে, যে শাসনকে তারা ‘ফ্যাসিবাদী’, ‘হত্যাযজ্ঞপূর্ণ’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে বর্ণনা করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক মেরামতের পথ তৈরি হবে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মিলিত মূল্যায়ন

তারেক রহমানকে ঘিরে দ্য ইকোনমিস্টের এই পূর্বাভাস নতুন নয়। এর আগে টাইম ম্যাগাজিন, ব্লুমবার্গ-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম একই ধরনের বিশ্লেষণে তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দেখেছে।

২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার দৃশ্য বর্ণনা করে সাময়িকীটি লিখেছে, বুলেটপ্রুফ বাসে করে ফেরার সময় উচ্ছ্বসিত সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে আসেন এবং বাসটি কয়েক মাইল ধীরগতিতে চলে—যেন সবাই তাকে কাছ থেকে দেখতে পারেন।

‘যথাযথ নির্বাচন’-এর অভাব ও ভোটাধিকার প্রশ্ন

দ্য ইকোনমিস্টের মতে, ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো ‘যথাযথ’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কখনো প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি।

নিরাপত্তা বিষয়ক থিঙ্কট্যাংক বিআইপিএসএস-এর বিশ্লেষক শাফকাত মুনিরকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “আমার জীবনের দুই দশক ধরে আমার ভোটের কোনো মূল্য ছিল না।” তিনি আরও বলেন, বর্তমানে রাজধানীর রাস্তাঘাটজুড়ে নির্বাচনী ব্যানার দেখা যাচ্ছে—যা অতীতের তুলনায় ভিন্ন এক চিত্র।

অন্তর্বর্তী সরকার ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচনই শেষ বড় দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছে সাময়িকীটি। যদিও অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, সরকারটি অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় আনতে সক্ষম হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনীতিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন কিছু সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে সহায়ক হবে। এর মধ্যে রয়েছে—নতুন একটি উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা।

জামায়াত প্রসঙ্গ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, দলটি সংযত শাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের অগ্রগতি শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, দলটি এবারের নির্বাচনে একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। পাশাপাশি, সংসদে কখনোই ১৮টির বেশি আসন না পাওয়া দলটির দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

এই বাস্তবতাই তারেক রহমান ও বিএনপির জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করে সাময়িকীটি, কারণ জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে।

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি

দ্য ইকোনমিস্ট স্মরণ করিয়ে দেয়, বিএনপি দীর্ঘদিন পরিচালিত হয়েছে তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এবং তার আগে দলটি পরিচালনা করেছিলেন তার বাবা, যিনি ১৯৮১ সালে নিহত হন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।

তারেক রহমান নির্বাচনী ইশতেহারে বিস্তারিত না দিলেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তরুণদের বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও প্রতি বছর ৫ কোটি গাছ লাগানোর অঙ্গীকার করেছেন।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রতিশোধহীন রাজনীতি

প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমানের মতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। তিনি ২০২৪ সালের বিক্ষোভে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তার ভাষায়, “প্রতিশোধপরায়ণ হওয়া কারও জন্যই ভালো কিছু বয়ে আনে না।”

বদলে যাওয়া তারেক রহমান?

দ্য ইকোনমিস্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর অনেকের কাছেই তারেক রহমান আগের চেয়ে ভিন্ন মনে হচ্ছে। যদিও এখনো অনেক মানুষ ‘অফ দ্য রেকর্ড’ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন—নির্বাচনের ফল অনিশ্চিত থাকার কারণে।

সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের চোখে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, আর সেই সন্ধিক্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতেই উঠে আসছে তারেক রহমানের নাম।

সর্বশেষ সংবাদ

‘সার্ভিস’ শব্দের বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু কী মানুষের মুক্তি ঘটেছে?

সুফি সাগর সামস্ ভাষা, ক্ষমতা ও মানবমর্যাদা নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা সভ্যতার ইতিহাসে শব্দ কখনো কেবল শব্দ নয়; তারা একটি যুগের সামাজিক...

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ, জরুরি সংবাদ সম্মেলন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, শুক্রবার: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন জাতীয় সংসদের...

মানবমস্তিষ্ক: মহাবিশ্বের ভেতর আরেক মহাবিশ্ব

সুফি সাগর সামস্ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি কি কোনো নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা কৃষ্ণগহ্বর? হয়তো নয়। হয়তো সবচেয়ে বিস্ময়কর কাঠামো হলো মানবমস্তিষ্ক—কারণ এই ক্ষুদ্র জৈবিক অঙ্গই সমগ্র মহাবিশ্বকে...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেলে স্বাধীনতার মূল্যবোধও হারাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা না গেলে একসময় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধও হারিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ...

এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না : ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে...

জনপ্রিয় সংবাদ