বিশেষ প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবারও জোট–সমীকরণে সরব হয়ে উঠেছে। নতুন ও পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা পুনর্নির্ধারণে ব্যস্ত, আর সেই ব্যস্ততার কেন্দ্রে রয়েছে বহুপাক্ষিক জোটবদ্ধতার চেষ্টা। এর মধ্যেই বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম, নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি ও বাম রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত সম্ভাব্য জোট নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
আগামী নির্বাচন সামনে রেখে জোটের সমীকরণ চূড়ান্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপির সঙ্গে রাজপথে থাকা দলগুলো নিয়ে বৃহৎ জোট গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ইতোমধ্যে বিএনপি ২৩৭ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করলেও সমমনা দলগুলোর জন্য বেশ কিছু আসন রেখে দেওয়া হয়েছে। সমমনাদের কাকে কোন আসনে প্রার্থী করা যায়, এ নিয়ে বিএনপি এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। বিএনপির সঙ্গে থাকা দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ছয়টি দলের জোট গণতন্ত্র মঞ্চ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ১২-দলীয় জোট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, এলডিপি, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও গণফোরাম।
বিএনপি–জামায়াতের পুরোনো সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায়
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট রাজপথে আন্দোলন–সংগ্রামে সক্রিয় ছিল। একসময় জামায়াতে ইসলামীও এ জোটের অন্যতম সহযোগী হিসেবে সমমনা পরিচয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে এসেছে। যদিও গত কয়েক বছরে দুই পক্ষের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক শিথিল হয়েছিল, তবুও নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জামায়াতের নতুন উদ্যোগ রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষপর্যায়ের সূত্র জানায়, দলটি নেতৃত্বে একটি নতুন নির্বাচনি জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এতে কয়েকটি ক্ষুদ্র–মাঝারি রাজনৈতিক দল যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
রাজনীতির নতুন মুখ—জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)
নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর ভিড়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বর্তমানে বিশেষভাবে আলোচনায়। দলটি আত্মপ্রকাশের পর থেকেই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা ছিল—তারা কি ক্ষমতাবানদের দিকে ঝুঁকবে, নাকি বিরোধী জোটের সঙ্গে নতুন পথে হাঁটবে?
অবশেষে দলটির অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। সূত্র মতে, এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এমবিপি) ও কয়েকটি নবগঠিত দল নিয়ে নতুন জোট গঠনের যে উদ্যোগ চলছে, তার মূল কেন্দ্রেই রয়েছে এনসিপি।
বাম দলের বৃহত্তর জোট–প্রচেষ্টা
এদিকে বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলোও পিছিয়ে নেই। বৃহত্তর বাম জোট গঠনের উদ্যোগ গত কয়েক সপ্তাহে আরও দ্রুত হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল দলগুলো আলোচনায় বসছে একটি একীভূত বাম প্ল্যাটফর্ম গড়ার উদ্দেশ্যে। তাদের লক্ষ্য—ক্ষমতাসীন দল ও বৃহৎ বিরোধী শক্তিগুলোর বাইরে একটি বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা।
নির্বাচনি বৈতরণি পাড়ি দিতে জোটই ভরসা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এককভাবে মাঠে নামা এখন আর কার্যকর কৌশল নয়। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি কিংবা বাম দল—সবাই নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও টিকে থাকার জায়গা নিশ্চিত করতে জোট–সমীকরণের ওপর জোর দিচ্ছে।
তবে এসব জোট কতটা স্থায়ী হবে, আদৌ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে—তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আসন্ন নির্বাচনের প্রচার–পর্ব পর্যন্ত।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন হিসাব–নিকাশের সূচনা
সমগ্র চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে আবারও একত্র হতে চাইছে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি। নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর আগমন, পুরোনো শক্তিগুলোর পুনর্বিন্যাস এবং বাম রাজনীতির নতুন কাঠামো—সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগে দেশের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে জোট–রাজনীতির নতুন অধ্যায়।


