কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি

কেরানীগঞ্জে এক শিক্ষিকার বাসা থেকে শিক্ষার্থী কিশোরী জোবাইদা রহমান ফাতেমা (১৪) ও তার মা রোকেয়া রহমানের (৩২) লাশ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশ জানায়, প্রায় ২১ দিন আগে মা-মেয়েকে হত্যা করে বাসার ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনায় শিক্ষিকা মীম আক্তার (২৪) ও তার আপন ছোট বোন নুসরাত জাহান (১৫)–কে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় কেরানীগঞ্জের একটি ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকলে বাসার একটি কক্ষ তল্লাশি করা হয়। এ সময় খাটের নিচে একটি লাশ দেখতে পেয়ে শিক্ষিকার স্বামী চিৎকার করলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে রোকেয়া রহমানের লাশ খাটের ভেতর থেকে এবং পরে বাথরুমের ফলস ছাদের ভেতর থেকে তার মেয়ে ফাতেমার লাশ উদ্ধার করে।
প্রাইভেট পড়তে গিয়ে নিখোঁজ
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে সদ্য নবম শ্রেণিতে ওঠা ফাতেমা প্রাইভেট পড়তে শিক্ষিকা মীম আক্তারের বাসায় যায়। দীর্ঘ সময় ফিরে না আসায় সন্ধ্যায় তাকে খুঁজতে ওই বাসায় যান তার মা রোকেয়া রহমান। এরপর থেকে মা-মেয়ে দুজনই নিখোঁজ ছিলেন।
এ ঘটনায় ২৭ ডিসেম্বর রোকেয়ার স্বামী শাহীন আহমেদ কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে ৬ জানুয়ারি অপহরণ মামলা দায়ের করা হলেও লাশ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঋণের জামিন নিয়ে বিরোধে হত্যাকাণ্ড
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম জানান, নিহত রোকেয়া রহমান শিক্ষিকার প্রতিবেশী ছিলেন এবং একটি এনজিও থেকে নেওয়া দেড় লাখ টাকার ঋণের জামিনদার (গ্রান্টার) ছিলেন তিনি। শিক্ষিকা সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় এনজিও রোকেয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়।
ওসি জানান, ঘটনার দিন বিকাল সোয়া ৫টার দিকে ফাতেমা প্রাইভেট পড়তে এলে শিক্ষিকার ছোট বোন নুসরাতের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে নুসরাত ফাতেমার গলা চেপে হত্যা করে। পরে সিসিটিভি ক্যামেরা ফাঁকি দিতে ফাতেমার জামা খুলে নুসরাত তা পরে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়, যেন মনে হয় ফাতেমা বাসা ছেড়ে চলে গেছে।
এর প্রায় দুই ঘণ্টা পর শিক্ষিকা মীম রোকেয়াকে ফোন করে জানান, তার মেয়ে অসুস্থ। মেয়েকে নিতে এলে বাসায় ঢোকার পর নুসরাত ও মীম দুজন মিলে ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে রোকেয়াকে হত্যা করে।
বাসায় স্বাভাবিক জীবনযাপন
হত্যার পর ফাতেমার লাশ বাথরুমের ফলস ছাদের ভেতর এবং রোকেয়ার লাশ বক্স খাটের ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়। লাশ বাসায় রেখেই তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিল। এমনকি গত ৬ জানুয়ারি শিক্ষিকার তিন বছরের ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে পুরো পরিবার ফরিদপুরের ভাঙ্গায় নানাবাড়িতেও যায়।
শিক্ষিকার স্বামী পেশায় রংয়ের ডিলার। বাসায় দুর্গন্ধ নিয়ে প্রশ্ন করলে স্ত্রী জানান, বাইরে কোনো কুকুর মরে থাকায় গন্ধ আসছে। পরে গন্ধ সহ্য করতে না পেরে তিনি নিজেই ঘর তল্লাশি করলে লাশের সন্ধান পান।
পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ
নিহত রোকেয়ার স্বামী ও মামলার বাদী শাহীন আহমেদ অভিযোগ করেন,
“আমি বারবার বলেছি ওই ফ্ল্যাট সার্চ করতে। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বা কললিস্টও বিশ্লেষণ করেনি। এগুলো করলে অন্তত অনেক আগেই লাশ পাওয়া যেত।”
তিনি ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
আদালতে প্রেরণ, নাবালিকাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হবে
ওসি সাইফুল আলম জানান, গ্রেফতার দুই বোন হত্যার দায় স্বীকার করেছে। শুক্রবার তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। আসামি নুসরাত জাহান (১৫) নাবালিকা হওয়ায় তাকে গাজীপুরের কোনাবাড়ি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত চলছে।


