বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬

আপসহীনতার প্রতীক খালেদা জিয়া: হার না মানা সংগ্রামের এক অনন্য অধ্যায়

পাঠক প্রিয়

সুফি সাগর সামস্

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী,

বিএনপির চেয়ারপারসন এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রেই শুধু ছিলেন না, বরং দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী রাজনীতির প্রতীক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আপসহীন অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি পরিচিতি পান ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।

শোক থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয় এক অনিশ্চয়তা। সে সময় বিএনপি নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থানরত খালেদা জিয়া তখনো সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। তবে পরিবর্তিত বাস্তবতায় ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন। এ সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে দল ও দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

নেতৃত্বে দ্রুত প্রতিষ্ঠা

রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন এবং একই বছরের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩, ২০০৯ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলেও তিনি চেয়ারপারসনের দায়িত্বে বহাল থাকেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা

আশির দশকে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ। দলকে সংগঠিত করে তিনি ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ সময় তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়—১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে এবং ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর। তবে এসব গ্রেপ্তার আন্দোলনের গতি থামাতে পারেনি।
১৯৮৭ সাল থেকে ‘এরশাদ হটাও’ আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যান। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

রাষ্ট্রক্ষমতায় তিন মেয়াদ

১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালে জোট সরকারের প্রধান হিসেবে তৃতীয়বার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। তাঁর শাসনামলে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নির্বাচনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো সচল রাখার উদ্যোগ ছিল আলোচনায়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর চেয়ারপারসনের দায়িত্ব তিনি দুইবার পালন করেন। নির্বাচনী রাজনীতিতে তার একটি ব্যতিক্রমী রেকর্ড রয়েছে—পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই জয় লাভ।

ওয়ান ইলেভেন ও কারাবাস

২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, যাকে রাজনৈতিক ভাষায় ‘ওয়ান ইলেভেন’ বলা হয়, খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকাকালে তাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা ও চাপের কথা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়। তবে তিনি দেশ ছাড়েননি। পরবর্তী সময়ে সব মামলায় জামিন পান।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মামলা ও উচ্ছেদ

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭টি। এসব মামলায় তিনি টানা প্রায় সাত বছর কারাবন্দি ছিলেন।
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই বাড়িতে তিনি প্রায় ২৮ বছর বসবাস করেছিলেন। বাড়িটি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার তার নামে বরাদ্দ দিয়েছিলেন।

আপসহীন অবস্থান

রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল দৃঢ় ও অনড়। এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ওয়ান ইলেভেন কিংবা পরবর্তী সময়—কারাবাস, মামলা ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও তিনি আপস করেননি। গত দেড় দশকে রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখে পড়লেও তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেননি।

রাজনৈতিক মূল্যায়ন

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকা। ক্ষমতায় থাকুন বা বিরোধী দলে—তিনি ছিলেন সংগ্রামী রাজনীতির প্রতীক। এ কারণেই দল-মত নির্বিশেষে তিনি শ্রদ্ধা ও আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছেন এক দীর্ঘ লড়াইয়ের নাম—যেখানে আপসহীনতা ও দৃঢ়তাই ছিল তার প্রধান রাজনৈতিক পরিচয়।

সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যনিস্ট পার্টি-বিএইচপি।

সর্বশেষ সংবাদ

‘সার্ভিস’ শব্দের বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু কী মানুষের মুক্তি ঘটেছে?

সুফি সাগর সামস্ ভাষা, ক্ষমতা ও মানবমর্যাদা নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা সভ্যতার ইতিহাসে শব্দ কখনো কেবল শব্দ নয়; তারা একটি যুগের সামাজিক...

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ, জরুরি সংবাদ সম্মেলন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, শুক্রবার: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন জাতীয় সংসদের...

মানবমস্তিষ্ক: মহাবিশ্বের ভেতর আরেক মহাবিশ্ব

সুফি সাগর সামস্ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি কি কোনো নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা কৃষ্ণগহ্বর? হয়তো নয়। হয়তো সবচেয়ে বিস্ময়কর কাঠামো হলো মানবমস্তিষ্ক—কারণ এই ক্ষুদ্র জৈবিক অঙ্গই সমগ্র মহাবিশ্বকে...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেলে স্বাধীনতার মূল্যবোধও হারাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা না গেলে একসময় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধও হারিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ...

এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না : ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে...

জনপ্রিয় সংবাদ