ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীর নীলনগরে অবস্থিত মুকুল নিটওয়্যার লিমিটেড—এক শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা—সম্প্রতি চরম আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠাতা মো. মইনুল ইসলাম মুকুল ৬৭০ জন শ্রমিক নিয়ে কারখানাটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ক্রয়াদেশ সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত ১৭ ডিসেম্বর কারখানার স্থায়ী বন্ধের ঘোষণা দেন।
কারখানার কোয়ালিটি পরিদর্শক মো. শরিফ হোসেন জানান, এখানে ২৮০ জন পুরুষ ও ৩৯০ জন নারী শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। তাদের জীবন ও সংসার এখন অনিশ্চিত।
শিল্পাঞ্চলে কারখানা বন্ধের বিস্তার
শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় মোট ৩২৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে।
-
গাজীপুরে বন্ধ হয়েছে ১৮৮টি কারখানা, যার ফলে ১,১৫,৩৭৯ জন শ্রমিক বেকার হয়েছেন। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানার কারণে বেকার হয়েছেন ৯০,৭৬০ জন শ্রমিক।
-
সাভার ও আশুলিয়ায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ১৩৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ ৬৭টি ও অস্থায়ীভাবে ৭২টি। প্রায় ৪০,০০০ শ্রমিক এর দ্বারা প্রভাবিত।
বন্ধ হওয়া নামি কারখানার মধ্যে রয়েছে:
-
বেক্সিমকোর ১৩টি কারখানা
-
শ্রীপুরের ডার্ড কম্পোজিট
-
টঙ্গীর খাঁপাড়া এলাকার সিজন ড্রেসেস
-
কোনাবাড়ীর পলিকন লিমিটেড, টেক্সটিল ফ্যাশন, ষ্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, ক্লাসিক ফ্যাশন, লা-মুনি অ্যাপারেলস
-
নাসা গ্রুপের লিজ ফ্যাশন, স্বাধীন গার্মেন্ট, মিককিফ অ্যাপারেলস
শ্রমিকদের অবস্থা
বেকার শ্রমিকদের ৯০% এখন চাকরি ছাড়া পড়েছেন। অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে রিকশা চালানো, দিনমজুরি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িয়েছেন। কিছু শ্রমিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকছেন।
লিজ অ্যাপারেলসের সাবেক সুপারভাইজার মো. রুস্তম আলী বলেন, “এখানে কাজ করে গর্ব বোধ করতাম। বেতন সময়মতো মিলত। কিন্তু এপ্রিল ২০২৪ থেকে সবকিছু উলটপালট হয়ে গেছে। সংসার কিভাবে চলবে সেই চিন্তায় চোখে-মুখে অন্ধকার।”
স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাড়িভাড়ায় প্রভাব
কাশিমপুর, চক্রবর্তী এলাকা: শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল দোকান, বাজার ও অন্যান্য ব্যবসা। কারখানা বন্ধের ফলে শ্রমিকরা গ্রামে ফিরে গেছেন। ফলে অনেক বাড়ি ও দোকান ফাঁকা পড়ে আছে। বাড়ির মালিকেরা ব্যাংক ঋণ নিয়ে নির্মিত বাড়িতে ভাড়া না পাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
আশুলিয়া, বুড়ির বাজারের মুদি ব্যবসায়ী শফিকুর রহমান বলেন, “আগে প্রতিদিন ১০–১৫ হাজার টাকার বিক্রি হতো, এখন তা তিন-চার হাজারে নেমে গেছে।”
শ্রমিক সংগঠন ও স্থানীয় পুলিশের মতামত
জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক জোটের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুজ্জামান বলেন, নতুন কারখানা গড়ে উঠছে না। চালু কারখানাগুলিতে প্রতিদিনই শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। শ্রমিকরা এখন টেইলারিং, কাপড়ের দোকানসহ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন বা গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছেন।
শিল্প পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন বলেন, “জ্বালানিসংকট, ব্যাংকিং খাতের অসহযোগিতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাজ না থাকা, কার্যাদেশ বাতিল এবং শ্রমিক আন্দোলনের কারণে একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বেকার হচ্ছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত হচ্ছে।”
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু যোগ করেন, “পেটের দায়ে শ্রমিকরা অন্য কাজে যোগ দিতে না পারায় অনেকেই বিপথে চলে যাচ্ছেন।”
গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক সমাজ ও স্থানীয় অর্থনীতি সংকটাপন্ন। বেকারত্ব, স্থানীয় ব্যবসার ক্ষতি, বাড়িভাড়া ও বাজারের ক্ষতি, এবং সামাজিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এই শিল্পাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ভয়াবহ চিত্র呈 করছে।


