সুফি সাগর সামস্

বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি মহান মুক্তিযুদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে ইতিহাস বিকৃতি ও বিভ্রান্তিমূলক বিতর্ক যখন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে, তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা—গণতন্ত্র, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা—নিয়ে পুনর্মূল্যায়ন জরুরি হয়ে উঠেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান ও চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলন—এই ধারাবাহিক সংগ্রামই রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুন করে দিকনির্দেশনা দেয়। এই বিশেষ ক্রোড়পত্রে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিমূল, গণতন্ত্রহীনতার দায় এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথনকশা।
স্বাধীনতা: জাতির সর্বোচ্চ অর্জন
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন মহান স্বাধীনতা। স্বাধীনতার চেয়ে বড় কিছু নেই। স্বাধীনতার ইতিহাসে যার যে অবদান—তা নিঃসংকোচে স্বীকার করাই একটি পরিণত জাতির পরিচয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব এবং শহীদ জিয়াউর রহমানের ঘোষণায় নয় মাসব্যাপী যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তা ছিল একটি সর্বজনীন জনযুদ্ধ। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী—সর্বস্তরের মানুষের আত্মত্যাগে গড়ে উঠেছিল এই ঐতিহাসিক বিজয়।
এই মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের যথাযথ সম্মান ও অংশগ্রহণকারী সব শক্তির অবদান স্বীকৃতি পাওয়াই মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষার মূল শর্ত। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অস্বীকার করতে গিয়ে স্বাধীনতা-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে বিকৃত করার সুযোগ নেই।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা: একাত্তর, নব্বই ও চব্বিশ
বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল ১৯৭১ সালেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ধারাবাহিক গণসংগ্রামের ইতিহাস। স্বৈরাচারবিরোধী নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং চব্বিশের ফ্যাসিবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান—এই ধারাবাহিকতারই অংশ। প্রতিটি আন্দোলনই তার সময়ের বাস্তবতায় গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছিল।
এই আন্দোলনগুলোর প্রত্যেকটিরই নিজস্ব গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে। একটিকে স্বীকার করে অন্যটিকে অস্বীকার করার প্রবণতা ইতিহাসকে খণ্ডিত করে এবং জাতির ঐক্যকে দুর্বল করে।
গণতন্ত্রহীনতার দায় ও রাষ্ট্রের সংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের চার মূলনীতি অতীতে যেমন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, বর্তমান রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের পেছনেও মূলত দায়ী দীর্ঘদিনের গণতন্ত্রহীনতা। ধাপে ধাপে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে, এবং জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় কীভাবে রাষ্ট্র আজকের অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে—তা নিরপেক্ষ ও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা এখন সময়ের দাবি। কারণ ইতিহাসের এই পাঠ ছাড়া ভবিষ্যতের জন্য কোনো টেকসই পথনকশা তৈরি করা সম্ভব নয়।
মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নবিদ্ধ হলে রাষ্ট্র প্রশ্নবিদ্ধ
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতিফলন। এটি নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কাঠামো কেমন হবে—এসব বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের ভিত্তিমূল। এই ভিত্তিমূল প্রশ্নবিদ্ধ হলে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই বাংলাদেশ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি জাতিরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এই ভিত্তিকে ধারণ করেই জাতিকে সামনে এগোতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ বাদ দিয়ে কোনো রাষ্ট্রীয় দর্শন বা রাজনৈতিক প্রকল্প টেকসই হতে পারে না।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুল আমিন বেপারীর মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলো সরাসরি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে নয়। বরং প্রশ্ন উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, বৈষম্যহীন সমাজ, জনগণের ঐক্য—সেগুলো কীভাবে পরবর্তী সময়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধারা যে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাস্তবে দীর্ঘদিন তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অগণতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ফলে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে নিঃশেষ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল—এই বাস্তবতাই নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ঐক্যের প্রয়োজন
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক দেশের জন্য ক্ষতিকর—এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শক্তিগুলোকে উপেক্ষা করে কোনো টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধকে অবজ্ঞা করে রাজনীতি করতে গেলে সমাজে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়।
একই সঙ্গে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিটকেই ধারণ করে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায়—এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা।
একাত্তর ও চব্বিশ: একই চেতনার দুই অধ্যায়
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের মতে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, আদর্শ ও অভীষ্ট এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা একই সূত্রে গাঁথা। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন সহাবস্থানের আকাঙ্ক্ষাই উভয় সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু।
একাত্তরে সংগ্রাম ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে; চব্বিশে সংগ্রাম কর্তৃত্ববাদী চোরতন্ত্রের বিরুদ্ধে। উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ্য ছিল মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন।
ভবিষ্যতের পথনির্দেশ
মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের অতীত নয়—এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক। ইতিহাস বিকৃতি কিংবা বিভাজনমূলক বিতর্ক নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা—গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার—বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই জাতি সামনে এগোতে পারে।
একাত্তর থেকে চব্বিশ—এই দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


