অনলাইন ডেস্ক

দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিন বুধবার (২৮ জানুয়ারি) প্রায় ৩ হাজার ৩০০ শব্দের একটি বিশাল বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে তারেক রহমানকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘Bangladesh’s Prodigal Son’ বা ‘প্রত্যাবর্তনকারী উত্তরাধিকারী’ হিসেবে। টাইম লিখেছে, কণ্ঠস্বর ভাঙা ও শারীরিক দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালনের বিষয়ে তারেক রহমানের সংকল্প স্পষ্ট।
দেশে ফেরার পর এটাই তারেক রহমানের প্রথম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার। টাইমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,
“দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশের মানুষ আমাকে যে আস্থা দিয়েছে, সেটাই রাজনীতিতে থাকার প্রধান কারণ।”
তিনি স্পষ্ট করেন, পারিবারিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং দলীয় সমর্থক ও জনগণের প্রত্যাশাই তাকে সামনে এনেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই তার মা ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু তাকে ব্যক্তিগতভাবে গভীরভাবে নাড়া দিলেও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি অনড় অবস্থানে রয়েছেন।
টাইমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমান পরিষ্কারভাবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তার নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রতি প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থন দেখানো হয়েছে ১৯ শতাংশ।
প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং যুব বেকারত্বকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়াকে তারেক রহমানের জন্য বড় পরীক্ষা বলে উল্লেখ করেছে টাইম।
নীতিগতভাবে তাকে একজন ‘টেকনোক্র্যাটিক’ রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে তারেক রহমানের পরিকল্পনার মধ্যে খাল খনন, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, ঢাকায় নতুন সবুজ অঞ্চল তৈরি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে অংশীদারত্বের কথা উল্লেখ করা হয়। তার বিশ্বাস, এসব পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতেও পারলে জনগণের সমর্থন নিশ্চিত হবে।
টাইম ম্যাগাজিন প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারী হিসেবে উল্লেখ করে তার পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, ছাত্র আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ইসলামপন্থি রাজনীতির উত্থান নিয়েও বিশদ আলোচনা করেছে। এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টা এখনো অসম্পূর্ণ এবং নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
নিজেকে তুলনামূলকভাবে নরম ও শ্রোতা-মনস্ক নেতা হিসেবে তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন,
“মানুষ যেন রাস্তায় নিরাপদ থাকে, ব্যবসা করতে পারে—এটাই আমার প্রথম অগ্রাধিকার।”
একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করে বলেন, আজ কাউকে নিষিদ্ধ করলে ভবিষ্যতে অন্যদেরও নিষিদ্ধ করা হতে পারে।
টাইমের মূল্যায়নে বলা হয়, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আশার সঞ্চার করেছে ঠিকই, তবে অতীতের ভার, দলীয় শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা—এই তিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে সেই আশা দ্রুতই ম্লান হয়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে স্পাইডার-ম্যান সিনেমার একটি সংলাপ উদ্ধৃত করে তারেক রহমান বলেন,
“বড় ক্ষমতার সঙ্গে বড় দায়িত্বও আসে। আমি মনেপ্রাণে এটি বিশ্বাস করি।”
সূত্র: টাইম ম্যাগাজিন


