বিশেষ প্রতিবেদক

দীর্ঘ কয়েক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর আবারও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘ। আকস্মিক হামলা ও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনায় সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে ইসরায়েল ও ইরান। এতে পুরো অঞ্চলজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা।
আকস্মিক হামলা, সাইরেনে স্তব্ধ ইসরায়েল
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সামরিক অভিযানকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দমনে “জরুরি পদক্ষেপ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মার্কিন সহযোগিতায় পরিচালিত অভিযানে ইরানের একাধিক কৌশলগত সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
শনিবার সকালে সাবাত পালনের সময় হঠাৎ সাইরেন বেজে ওঠে ইসরায়েলজুড়ে। বহু মাস পর আবারও সেই সতর্কবার্তা—যা নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য করে। সেনাবাহিনী জানায়, সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলার আশঙ্কায় এই সতর্কতা জারি করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর আসে, ইরান থেকে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
পাল্টা হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, তাদের ওপর চালানো ‘বর্বর’ হামলার জবাব হিসেবেই কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুর পর্যন্ত অন্তত ৪০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।
ইসরায়েলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই ধ্বংস করলেও কিছু রকেট খোলা স্থানে আঘাত হানে। বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসাবশেষ পড়ে সীমিত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
জনজীবন থমকে, বিমানবন্দর বন্ধ
দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে। হাজারো যাত্রী আটকা পড়েছেন বা বিকল্প গন্তব্যে পাঠানো হচ্ছে। একইসঙ্গে বড় ধরনের জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে হোম ফ্রন্ট কমান্ড।
রাজধানী তেল আবিব ও জেরুজালেমসহ বিভিন্ন শহরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত বন্ধ। নির্ধারিত উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাজনৈতিক বিক্ষোভ কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে।
হাসপাতালগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতায়
সম্ভাব্য বড় ধরনের হতাহতের আশঙ্কায় হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ ভূগর্ভস্থ বাংকারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জীবন রক্ষাকারী অস্ত্রোপচার ও সংকটাপন্ন রোগীদের সুরক্ষিত স্থানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সাধারণ নাগরিকদের অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া হাসপাতালে না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত। কর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।
আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
যাদের নিজস্ব সুরক্ষিত কক্ষ নেই, তারা মেট্রো স্টেশন ও ভূগর্ভস্থ পার্কিং লটে আশ্রয় নিয়েছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে পরিবারগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। অনেকেই একে অপরকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ কেউ প্রার্থনায় মগ্ন—যেন দ্রুত এই সংঘাতের অবসান ঘটে।
উত্তর ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সৃষ্ট গর্তে পড়ে একজন প্রৌঢ় সামান্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক মহল থেকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হলেও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতির পর যে আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, তা নতুন করে ভেঙে পড়ার মুখে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এর প্রভাব পড়তে পারে—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সব ক্ষেত্রেই।
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একথা স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক অগ্নিগর্ভ সময়ের দিকে এগোচ্ছে।


