বিশেষ প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্য আবারও অগ্নিগর্ভ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর সঙ্গে ইরান-এর সরাসরি সামরিক সংঘাত এখন আর দুই দেশের সীমায় আবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়ছে গোটা অঞ্চলে। রকেট, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র আর পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে প্রশ্ন একটাই—এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে?
আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত মধ্যপ্রাচ্য
ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। হাইফায় রকেট হামলার জবাবে লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। পাশাপাশি যুদ্ধে জড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে হামাস ও ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন।
এদিকে যুক্তরাজ্য তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে; জার্মানিও অভিযানে যোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। অর্থাৎ সংঘাতটি ক্রমেই একটি বহুপাক্ষিক যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে—যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো সরাসরি অবস্থান নিচ্ছে।
পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা: বিপজ্জনক বার্তা
ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার অভিযোগ উঠেছে। যদিও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) আনুষ্ঠানিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ পায়নি, তবু এমন স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
অন্যদিকে ইরানও ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনা ও মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এমনকি উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ভুলবশত মিত্র দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে—যা যুদ্ধের অনিশ্চয়তাকেই সামনে আনে।
জ্বালানি নিরাপত্তা: বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো-র রাস তানুরা রিফাইনারিতে ড্রোন হামলা এবং কাতারের এলএনজি উৎপাদন সাময়িক বন্ধ—এই দুই ঘটনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে এ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মানেই তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি—যার প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আরও বেশি পড়বে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি: ভেঙে পড়েনি শাসনব্যবস্থা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, দেশটির শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সংবিধান অনুযায়ী অস্থায়ী পরিষদ গঠন এবং উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়া—এসব ইঙ্গিত দেয়, রাষ্ট্র কাঠামো এখনো কার্যকর রয়েছে।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত ‘ভিত্তিহীন বিপ্লব’ তত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বরং বহিরাগত হামলা অনেক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ঐক্য জোরদার করে—ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়।
ট্রাম্পের চার সপ্তাহের হিসাব: বাস্তবতা কতটা ভিন্ন?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, অভিযান চার সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কখনো ক্যালেন্ডার মেনে চলে না। আফগানিস্তান, ইরাক বা সিরিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে—‘স্বল্পমেয়াদি’ অভিযান বহু বছর ধরে দীর্ঘায়িত হতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি সমঝোতার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। অর্থাৎ সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপ—এই দ্বিমুখী কৌশলই এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতিয়ার।
আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিক প্রশ্ন
বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠন ইরানে হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী সার্বভৌম রাষ্ট্রে সামরিক আগ্রাসন বৈধতা পেতে হলে সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি প্রয়োজন। প্রশ্ন উঠছে—এই সংঘাত কি আত্মরক্ষার সীমা অতিক্রম করেছে?
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ সমাবেশে এ হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। এতে স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু আঞ্চলিক ইস্যু নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতির নৈতিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্যকেও নাড়া দিচ্ছে।
সামনে কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাবনা স্পষ্ট—
-
পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ – যেখানে আরও দেশ সরাসরি জড়িয়ে পড়বে।
-
সীমিত কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত – ছায়াযুদ্ধ, ড্রোন হামলা ও প্রক্সি লড়াই অব্যাহত থাকবে।
-
কূটনৈতিক সমঝোতা – বড় শক্তিগুলোর মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি।
মধ্যপ্রাচ্য বহুবার আগুনে পুড়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তার ছাই বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে।
আজকের প্রশ্ন তাই কেবল কে জিতবে, তা নয়—এই যুদ্ধের মূল্য কে দেবে?
যদি কূটনীতি ব্যর্থ হয়, তবে এর খেসারত দিতে হবে পুরো বিশ্বকে। এখন প্রয়োজন শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংযম। যুদ্ধের দাম সবসময়ই শান্তির চেয়ে বেশি।


