ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও স্পর্শকাতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সরকারপ্রধান আগামী তিন মাসের কর্মপরিকল্পনায় দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন। নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং রমজান ঘিরে বাড়তি চাহিদা—সব মিলিয়ে বাজার এখনো পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই।
রমজান শুরু হওয়ার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্যের দাম আবারও বাড়ায় নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে বাজার স্থিতিশীল করা শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রমজান ও তাৎক্ষণিক নির্দেশনা
মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে—
-
রমজানে জ্বালানি সরবরাহে যেন কোনো ঘাটতি না থাকে
-
নিত্যপণ্যের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়
-
প্রশাসন মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে তদারকি জোরদার করে
একই সঙ্গে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা তৈরির কথা বলা হয়েছে। কোন মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নেবে, তার সুস্পষ্ট তালিকা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজার তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় বৃদ্ধি, মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে আমদানিনীতিতে পরিবর্তনের মতো বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী:
-
জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি: ৮.৫৮%
-
খাদ্য মূল্যস্ফীতি: ৮.২৯%
-
খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি: ৮.৮১%
-
২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি: ৮.৭৭%
টানা চার মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও সবজির দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ: অভিযান নয়, দরকার কাঠামোগত সমাধান
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, আগামী তিন মাসে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দেওয়া যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তাঁর মতে, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির ফলে সাধারণ মানুষের আর্থিক সুরক্ষা কমে গেছে।
তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন, আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলা নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হওয়া জরুরি। সময়মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি এবং পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত না করলে অভিযান চালিয়ে স্থায়ী ফল পাওয়া যাবে না।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, আমদানি-রপ্তানি নীতিতে সামঞ্জস্য আনা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় জরুরি। প্রথম তিন মাসই হবে সরকারের দক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকৃত পরীক্ষা।
মুদ্রানীতি বনাম উৎপাদন
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছিল। নীতি সুদহার বাড়ানো হয় এবং ঋণপ্রবাহ সীমিত করার চেষ্টা করা হয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কঠোর মুদ্রানীতির ওপর জোর দিলেও দেশীয় বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সুদহার বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে, যা সরবরাহ সংকটকে আরও বাড়াতে পারে।
ব্যবসায়ীদের দাবি ও বাজারের বাস্তবতা
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো ছিল। ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকায় আমদানিতে সুবিধা হয়েছে। আগে যেখানে শতভাগ মার্জিনে এলসি খুলতে হতো, এখন ১০–২০ শতাংশ মার্জিনেই তা সম্ভব হয়েছে। এমনকি রমজানের পণ্যে আমদানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবু বাজারে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি দেখা যায়নি। এতে প্রশ্ন উঠছে—সমস্যা কি প্রকৃত সরবরাহে, নাকি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায়?
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো:
-
সরবরাহ শৃঙ্খলার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
-
ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা
-
মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা
-
উৎপাদন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি
-
মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বিত প্রয়োগ
প্রথম তিন মাসে যদি বাজারে দৃশ্যমান স্বস্তি ফেরানো যায়, তাহলে জনগণের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং আস্থা বাড়বে। আর যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি না আসে, তাহলে অর্থনৈতিক চাপ আরও গভীর হতে পারে।
সময়ই দেবে উত্তর
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে এটি সময়ের পরীক্ষা। বাজার নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বাস্তব প্রয়োগ কত দ্রুত ও কতটা কার্যকর হয় সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
প্রথম তিন মাসেই যদি চাল, ডাল, তেল, চিনি ও সবজির দামে স্থিতিশীলতা আসে এবং সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পান—তাহলেই বলা যাবে, সরকারের পদক্ষেপ সঠিক পথে রয়েছে। অন্যথায় মূল্যস্ফীতির চাপ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।


