সুফি সাগর সামস্

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা কেবল একটি বক্তৃতা বা আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়—বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা, কৌশলগত সংকেত এবং ভবিষ্যৎ ক্ষমতার দাবির ঘোষণা। বিএনপির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাংবাদিকদের এই প্রথম প্রকাশ্য সাক্ষাৎ তেমনই এক মুহূর্ত।
বনানীর হোটেল শেরাটনের বলরুমে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান যখন “প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার” কথা বলেন, তখন সেটি নিছক নৈতিক আহ্বান ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের শাসন-পদ্ধতির ওপর একটি পরোক্ষ indictment—যেখানে ক্ষমতা মানেই প্রতিশোধ, রাষ্ট্র মানেই দলীয় অস্ত্র।
অতীতকে সমাহিত করার ভাষা, ভবিষ্যৎ দখলের ইঙ্গিত
তার বক্তব্যের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ ছিল তিনটি প্রতীকী সময়চিহ্ন—
১৯৮১ সালের জানাজা,
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট,
এবং ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর।
এই তিনটি ঘটনার উল্লেখ কোনো আবেগী স্মৃতিচারণ নয়; বরং এটি ছিল একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক থিসিস:
বাংলাদেশ আর পুরোনো চক্রে ফিরতে পারবে না—ফিরলে রাষ্ট্রই ভেঙে পড়বে।
৫ আগস্টকে তিনি যে গুরুত্ব দিয়ে উচ্চারণ করেছেন, তা বিএনপির অতীত বক্তব্যের তুলনায় ভিন্ন। এটি ইঙ্গিত দেয়—রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সীমা অতিক্রম করলে ক্ষমতা আর টিকে থাকে না, ইতিহাস নিজেই তার রায় দেয়।
“প্রতিহিংসা নয়” — আদর্শ না কৌশল?
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের আহ্বান কি আদর্শগত রূপান্তর, নাকি কৌশলগত প্রয়োজন?
দেড় যুগ ক্ষমতার বাইরে থাকা, আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত অতীত, এবং দেশের ভেতরে একটি ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত সমাজ—এই বাস্তবতায় বিএনপির সামনে দুটি পথ ছিল:
এক, পুরোনো ভাষায় আগুন জ্বালানো;
দুই, রাষ্ট্রনায়কের ভাষায় বিশ্বাসযোগ্যতা নির্মাণ।
তারেক রহমান স্পষ্টভাবে দ্বিতীয় পথ বেছে নিয়েছেন।
গণমাধ্যমকে পাশে নেওয়ার রাজনীতি
সাংবাদিকদের প্রতি তার আহ্বান—“সমালোচনা হোক, কিন্তু সমাধানমুখী”—এটি ছিল নিছক সৌজন্য নয়। এটি ছিল একটি power alignment strategy। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গণমাধ্যম ক্ষমতার সঙ্গে সংঘাতে নয়, বরং চাপে ছিল। সেখানে বিএনপি চেয়ারম্যানের এই বক্তব্য গণমাধ্যমকে একটি বিকল্প রাজনৈতিক আশ্রয়ের ইঙ্গিত দেয়।
১০ মিনিটের উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল আরও বড় বার্তা—ক্ষমতা প্রশ্ন এড়ায় না, বরং প্রশ্নকে নিয়ন্ত্রণ করে।
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি: জনপ্রিয়তা না কাঠামো?
তারেক রহমানের প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনাগুলো—অ্যাগ্রি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, প্রিভেনশন হেলথ মডেল, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস—এসবকে একত্রে দেখলে বোঝা যায়, তিনি জনতুষ্টি নয়, স্টেট-ফাংশনালিটির কথা বলছেন।
বিশেষ করে পানি সংকট নিয়ে তার বক্তব্য ছিল অস্বাভাবিকভাবে নগ্ন ও সরাসরি। তিনি কার্যত স্বীকার করেন—ঢাকা একটি আসন্ন পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে উন্নয়ন নয়, জীবনধারণই প্রশ্নের মুখে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বক্তৃতায় এ ধরনের ভবিষ্যৎভিত্তিক, অজনপ্রিয় সত্য বলা বিরল।
তরুণ সমাজ: ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি
তারেক রহমানের বক্তব্যে একটি বার্তা স্পষ্ট—ক্ষমতার ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতে। কর্মসংস্থান ব্যর্থ হলে তিনি যে ভাষায় ১৯৭১, ১৯৯০ ও ৫ আগস্টের অর্জন ধ্বংস হওয়ার কথা বলেছেন, তা ছিল এক ধরনের সতর্কতা নয়, বরং রাজনৈতিক আত্মসমালোচনা।
এটি বিএনপির জন্যও এক কঠিন স্বীকারোক্তি—শুধু আন্দোলন নয়, কর্মসংস্থানই ভবিষ্যতের বৈধতা নির্ধারণ করবে।
সড়ক দুর্ঘটনা: রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নগ্ন পরিসংখ্যান
বছরে ৭ হাজার মানুষের মৃত্যু—এই সংখ্যাকে তিনি “স্বাভাবিক নয়” বলে চিহ্নিত করেছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে তিনি দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে নয়, স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স হিসেবে দেখছেন। দরিদ্র, একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষের মৃত্যু মানে রাষ্ট্রের নীরব সহিংসতা।
এই বিশ্লেষণ সরাসরি রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর দায় চাপায়।
কূটনৈতিক সাক্ষাৎ: ভেতরের ভাষা, বাইরের বার্তা
ভারত, পাকিস্তান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক বিএনপির আন্তর্জাতিক পুনঃপ্রবেশের স্পষ্ট ইঙ্গিত। বিশেষ করে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক বোঝায়—বিএনপি ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য করতে চাইছে।
এটি একই সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের জন্য একটি বার্তা:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কোনো একক গল্প থাকবে না।
পরিবর্তনের দাবি নাকি ক্ষমতার পুনর্গঠন?
তারেক রহমানের এই উপস্থিতি প্রশ্ন তোলে—তিনি কি সত্যিই প্রতিহিংসার রাজনীতির ইতি টানতে চান, নাকি প্রতিহিংসার ক্লান্ত সমাজকে ভিন্ন ভাষায় নেতৃত্ব দিতে চান?
উত্তর এখনও অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—
এই বক্তব্যে তিনি কেবল বিএনপির নেতা হিসেবে কথা বলেননি, কথা বলেছেন একজন সম্ভাব্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।
বাংলাদেশের রাজনীতি যদি আবার পুরোনো পথে ফেরে, তবে তা হবে ইচ্ছাকৃত অন্ধত্ব। আর যদি নতুন পথে হাঁটে—তাহলে এই বক্তৃতাই হয়তো ইতিহাসে প্রথম অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


