ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান শুরু করলেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হলো মূল স্লোগান—
‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।’
দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে এই প্রথম বড় কোনো নির্বাচনি জনসভা দিয়ে মাঠে নামলেন তিনি। বুধবার রাতে ঢাকা থেকে সিলেটে পৌঁছে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীর কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে সফর শুরু করেন তারেক রহমান। শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণ সুরমার বিরাইমপুর গ্রামে যাত্রাপথে দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ তাঁকে স্বাগত জানান—সিলেটবাসীর কাছে তিনি ‘দামান’, তরুণদের ভাষায় ‘দুলাভাই’।
দেশীয় রাজনীতি ও বিদেশি প্রভাবের সমালোচনা
জনসভায় তারেক রহমান বলেন, গত ১৫–১৬ বছর ধরে দেশকে অন্য দেশের কাছে “বন্ধক” দেওয়া হয়েছিল। একটি দল ক্ষমতায় বসেছে অন্য দেশের সহায়তায়—এমন অভিযোগ তুলে তিনি বলেন,
“দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার একমাত্র উৎস এ দেশের মানুষ। বাইরের কেউ নয়।”
তিনি দাবি করেন, একের পর এক নির্বাচনে ব্যালট ছিনতাই, নিশিরাতের ভোট ও ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিএনপি সেই অবস্থা বদলাতে চায়।
ধর্মীয় অনুভূতি ও রাজনৈতিক বার্তা
ভাষণের এক পর্যায়ে ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করেন তারেক রহমান। মাঠভর্তি জনতার কাছে প্রশ্ন রাখেন—কাবা, বেহেশত, দোজখ ও পৃথিবীর মালিক কে? জনতার একযোগে জবাব—“আল্লাহ।”
এরপর তিনি বলেন,
“যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি মানুষ দিতে পারে? অথচ একটি দল বেহেশতের টিকিট দেওয়ার কথা বলছে। এটা কি শিরক নয়?”
এই বক্তব্যে তিনি সরাসরি ধর্ম ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার রাজনীতির সমালোচনা করেন।
‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্রের স্বপ্ন
তারেক রহমান বলেন, শুধু ভোটের অধিকার নয়—মানুষকে স্বাবলম্বী করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করাই বিএনপির লক্ষ্য।
“করব কাজ, গড়ব দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ”—এই স্লোগান তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী দিনে বিএনপি সরকার গঠন করলে নবী করিম (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শে দেশ পরিচালনা করা হবে।
সিলেট থেকে ঢাকামুখী নির্বাচনি বহর
সিলেটের জনসভা শেষে সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে একদিনেই ছয়টি জেলার ছয়টি স্থানে পথসভা করেন তারেক রহমান। মৌলভীবাজারের শেরপুর, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, নরসিংদীর পৌর পার্ক ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন তিনি।
প্রতিটি সভায় তাঁর মূল বার্তা ছিল—
বিদেশি প্রভাবমুক্ত রাজনীতি, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, এবং ধানের শীষে ভোট দিয়ে “টেক ব্যাক বাংলাদেশ”।
জনসমাগম ও নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি
আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ জনসভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ডা. জুবাইদা রহমানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা ও ১১টি আসনের প্রার্থীরা।
মাঠের এক পাশে গুম ও শহীদ পরিবারের জন্য বিশেষ স্থান নির্ধারণ করা হয়—যা জনসভায় আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে।
সিলেট থেকে শুরু হওয়া এই নির্বাচনি অভিযাত্রা শুধু প্রচারণার সূচনা নয়, বরং বিএনপির পক্ষ থেকে তিনটি স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরল—
-
বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি
-
ধর্মের নামে রাজনীতির অপব্যবহারের বিরোধিতা
-
ভোটাধিকার ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার
১২ ফেব্রুয়ারির ভোট সামনে রেখে তারেক রহমানের এই সফর বিএনপির নির্বাচনি কৌশলে নতুন গতি আনল—রাজনৈতিক মাঠে এখন স্পষ্টতই শুরু হয়ে গেল মূল লড়াই।


