সুফি সাগর সামস্

ভোটের ঘণ্টা বেজেছে, আস্থার পরীক্ষা শুরু
একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তৎপরতা, প্রার্থী ঘোষণা, প্রচার–প্রচারণা এবং সমীকরণের নতুন হিসাব–নিকাশ। কিন্তু এই উৎসবমুখরতার আড়ালে স্পষ্ট হয়ে উঠছে কিছু গভীর উদ্বেগ ও বড় চ্যালেঞ্জ, যা এবারের নির্বাচনকে শুধুই একটি ভোট নয়, বরং গণতান্ত্রিক আস্থার বড় পরীক্ষায় পরিণত করেছে।
নির্বাচন ও গণভোট: কেন এটি ভিন্ন
এবারের নির্বাচন আলাদা কয়েকটি কারণে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোট যুক্ত হওয়ায় ভোটের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনব্যবস্থার আইন ও বিধিতে যেসব সংস্কার আনা হয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়েরও সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ভোটিং চালু হওয়াকে অনেকে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটার, ৫৫টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং বিপুলসংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী—সব মিলিয়ে অংশগ্রহণের দিক থেকে নির্বাচনটি ব্যাপক হওয়ার কথা।
সহিংসতা ও শঙ্কা: শুরুতেই যে প্রশ্নগুলো উঠছে
তবে তফসিল ঘোষণার পরপরই সম্ভাব্য প্রার্থীর গুলিবিদ্ধ হওয়া, নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা নির্বাচনি আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মব সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতার যে প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, তা ভোটারদের আস্থা ও অংশগ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছে না—ভোটের দিন তারা নিরাপদ পরিবেশে ভোট দিতে পারবে কি না।
নির্বাচন কমিশন: ক্ষমতা আছে, প্রশ্ন কার্যকারিতায়
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে আসছে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। আইন অনুযায়ী কমিশনের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে—আচরণবিধি লঙ্ঘনে প্রার্থিতা বাতিল থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও আছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতায় কমিশনের দৃশ্যমান কঠোরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এবার যদি কমিশন শুরু থেকেই নিরপেক্ষ ও দৃঢ় অবস্থান নেয়, তবে অনেক সংকট আগেভাগেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অন্যথায় অনিয়ম ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
রাজনৈতিক সদাচরণ: চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রবিন্দু
নির্বাচন যতটা কমিশনের, ততটাই রাজনৈতিক দলগুলোর। মনোনয়ন ঘিরে দলবদল, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং মাঠপর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা সংঘাত বাড়াতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা যদি সহনশীলতার পথে না হাঁটে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতায় রূপ দেয়, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সদিচ্ছাই হয়ে উঠছে সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম পূর্বশর্ত।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও মাঠ প্রশাসন
নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। সরকারি সুযোগ–সুবিধার অপব্যবহার, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ভোটের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়। মাঠ প্রশাসন, বিশেষ করে জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের পরস্পরবিরোধী অভিযোগ এই জায়গাটিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। এখানে সামান্য বিচ্যুতিও বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
অংশগ্রহণের প্রশ্ন ও ভোটার উপস্থিতি
এবারের নির্বাচনে একটি বড় রাজনৈতিক দল বাইরে থাকায় অংশগ্রহণের মাত্রা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আবার জাতীয় পার্টির মতো দলের অংশগ্রহণ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব দলের সমর্থকদের অবস্থান ভোটের মাঠে অপ্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক লড়াই নিশ্চিত করা গেলে ভোটার উপস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আস্থার পরীক্ষা
নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করবে এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। সরকারও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই আশ্বাস কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
আইনবিধি সংস্কার, সংসদ ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজন, প্রবাসী ভোটিং—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক হওয়ার সুযোগ রাখে। তবে সেই সুযোগ বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন কমিশনের কার্যকর কঠোরতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদাচরণের ওপর। ভোটের ঘণ্টা বেজেছে; এখন শুরু হলো গণতান্ত্রিক আস্থার আসল পরীক্ষা।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


