বিশেষ প্রতিবেদক

ঘন ঘন ভূমিকম্পে আবারও শঙ্কিত দেশ। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে অনুভূত হয় ৫ দশমিক ৪ মাত্রার একটি মাঝারি ভূমিকম্প। উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকা। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এ কম্পনে জেলার বিভিন্ন স্থানে কাঁচা ও টিনশেড ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরায় সৃষ্ট কম্পন রাজধানী ঢাকা হয়ে পূর্বে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অনুভূত হয়।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ফেব্রুয়ারির ২৭ দিনে দেশবাসী অন্তত ১০টি মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভব করেছে; ২৭ ফেব্রুয়ারির দুই দফা কম্পন আলাদা করে ধরলে সংখ্যা দাঁড়ায় ১১।
উৎপত্তিস্থল ও বিস্তার
ইউরোপীয় ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (ইএমএসসি) জানিয়েছে, সর্বশেষ ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল খুলনা শহর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং সাতক্ষীরা থেকে ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। ভূপৃষ্ঠ থেকে গভীরতা ছিল ৩৫ কিলোমিটার। ঢাকা ছাড়াও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এবং পার্শ্ববর্তী ভারতের কিছু এলাকাতেও কম্পন অনুভূত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হুমায়ূন আখতার বলেন, পরপর দুই দফায় কম্পনটি অনুভূত হয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয়।
আতঙ্কিত জনজীবন
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুমার নামাজের পরপরই হঠাৎ ঝাঁকুনি শুরু হলে মসজিদে থাকা মুসল্লিরা দ্রুত খোলা স্থানে বেরিয়ে আসেন। বহুতল ভবনের বাসিন্দারাও রাস্তায় নেমে পড়েন। আশাশুনি, তালা ও কলারোয়া উপজেলার কয়েকটি এলাকায় মাটির ঘর ধসে পড়ার খবর মিলেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে এত তীব্র ঝাঁকুনি তারা দেখেননি।
এক মাসে ১০–১১টি কম্পন
ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই একের পর এক ভূকম্পন অনুভূত হচ্ছে—
-
১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ৩ মাত্রার ভূমিকম্প
-
৩ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪.১ মাত্রা
-
একই সময়ে মিয়ানমারে ৫.৯ ও ৫.২ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প, যার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে
-
৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটে আরও দুটি কম্পন
-
১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ৪.১ মাত্রা
-
২৫ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে ৫.১ মাত্রার কম্পন
-
২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের সিকিমে ৩.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের প্রভাব
-
২৭ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরায় ৫.৪ মাত্রা
অতীতের অভিজ্ঞতা: বড় সতর্কবার্তা
গত নভেম্বরে ঘন ঘন ভূমিকম্পে দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশের অধিকাংশ এলাকা কেঁপে ওঠে। নিহত হন ১০ জন, আহত হন ছয় শতাধিক। পরদিনও তিনটি কম্পন অনুভূত হয়। বিশেষজ্ঞরা তখনই সতর্ক করেছিলেন—বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কেন ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশ?
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি এখানে ঐতিহাসিকভাবেই বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, সাতক্ষীরা অঞ্চল তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকলেও উত্তর ও পূর্বাঞ্চল উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকাকে মাঝারি ঝুঁকির মধ্যে ধরা হলেও ঘনবসতি ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের কারণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম: বিপদের মুখে বড় নগরী



সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, রাজধানীতে প্রায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবনের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার যৌথ জরিপ বলছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে অন্তত ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে তৈরি হতে পারে প্রায় ৭ কোটি টন কংক্রিটের স্তূপ।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবনের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বিভিন্ন মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ।
নগর পরিকল্পনাবিদরা রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামকে দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নগরী হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়; তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন—
-
জাতীয় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন
-
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা হালনাগাদ ও রেট্রোফিটিং
-
অজ্ঞাত ফল্ট লাইন চিহ্নিতকরণে গবেষণা
-
নিয়মিত মহড়া ও জনসচেতনতা কার্যক্রম
-
স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জরুরি প্রস্তুতি
বারবারের কম্পন যেন বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস না হয়ে ওঠে—এখনই সতর্কতা, পরিকল্পনা ও বাস্তব প্রস্তুতির সময় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


