নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতি এখন গ্যাসনির্ভরতার কারণে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সারের কারখানা, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে গৃহস্থালি—সব খাতেই প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু স্থানীয় গ্যাস মজুত দ্রুত হ্রাস পাওয়া এবং নতুন উৎস আবিষ্কারে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ বড় ধরনের জ্বালানি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ—অর্থনীতিতে ছড়াচ্ছে স্থবিরতা
জ্বালানি খাতে সংকট এতটাই প্রকট যে দেশের ১৩৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে ১৫টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কেন্দ্র আংশিক সক্ষমতায় চলছে। একইসঙ্গে গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন কারখানার চুল্লি ঠাণ্ডা, শিল্পকারখানার চাকা থমকে আছে, এবং গৃহস্থালির রান্নাঘরেও গ্যাস সংকটে জনজীবনে ভোগান্তি বাড়ছে।
জ্বালানি বিভাগ জানায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হঠাৎ কমে যায়, যার ফলে লোডশেডিং বেড়ে যায় এবং শিল্পখাতের উৎপাদন ব্যাহত হয়।
সাত বছরে চার গুণ বেড়েছে আমদানিনির্ভরতা
দেশীয় উৎপাদন কমতে থাকায় গত সাত বছরে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা চার গুণ বেড়েছে। এখন দেশের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশই নির্ভর করছে আমদানিকৃত এলএনজি, আমদানিকৃত কয়লা এবং বিদ্যুতের ওপর। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রতি জ্বালানি নীতিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, “গ্যাসের মতো কৌশলগত জ্বালানিতে উচ্চ আমদানিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এর দাম এবং সরবরাহ আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চিত।”
স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিক পতন
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, গত দুই দশকে দেশের গ্যাস উৎপাদন প্রতিবছর গড়ে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে কমেছে। বর্তমানে এই পতন আরও ত্বরান্বিত হয়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র—শেষ ভরসাতেও কমছে উৎপাদন
দেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানায় এখনো প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপন্ন হয়। তবে ক্ষেত্রটির উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত কমে আসছে। অন্যদিকে পুরোনো বেশির ভাগ গ্যাসক্ষেত্র প্রায় নিঃশেষের পথে।
নতুন অনুসন্ধানে সাফল্য নেই
স্থলভাগে অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ বাড়ানো হলেও ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “নতুন বড় গ্যাসাধার পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।”
সামুদ্রিক এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রমও দীর্ঘদিন ধরেই স্থবির। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহ কম, সরকারি প্রক্রিয়া ধীরগতি—সব মিলিয়ে সমুদ্র সম্পদও অঘোষিতভাবে অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে।
কয়লা, তেল ও নবায়নযোগ্য খাতে আশানুরূপ অগ্রগতি নেই
বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় কয়লা মজুত থাকা সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে কোনো কার্যকর কয়লা নীতি বা উত্তোলন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি।
এদিকে তেলের উল্লেখযোগ্য কোনো রিজার্ভও এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, ফলে আমদানিনির্ভরতাই বেড়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও অগ্রগতি খুব ধীর। নীতিমতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তির লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে সোলার ও উইন্ড মিলিয়ে ৫ শতাংশও অর্জিত হয়নি।
প্রতিদিন দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি
বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২,৫০০ থেকে ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি স্থায়ী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে, কিন্তু ডলার সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্য এই নির্ভরতা অস্থিতিশীল করে তুলছে।
বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে?—বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞরা একমত, বর্তমান চিত্র যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে—
-
বিদ্যুৎ উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বাড়বে
-
শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে, রপ্তানি কমবে
-
সারের ঘাটতি বাড়বে, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে
-
গৃহস্থালির ভোগান্তি আরও বাড়বে
-
বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে
-
সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ধীরগতি ও অনিশ্চয়তার দিকে যাবে
একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞের ভাষায়,
“এভাবে চলতে থাকলে আগামী তিন–চার বছরের মধ্যেই বাংলাদেশকে কঠোর জ্বালানি-সাশ্রয়ী অর্থনীতিতে যেতে বাধ্য হতে হবে।”
সামনের পথ—কী করা জরুরি
বিশেষজ্ঞরা দ্রুত নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন—
১. সমুদ্র ও স্থলভাগে অনুসন্ধান কার্যক্রম আধুনিকীকরণ
২. আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে চুক্তির কাঠামো সহজ করা
৩. কয়লা নীতি পুনর্বিবেচনা ও পরিবেশবান্ধব উত্তোলন নিশ্চিত করা
৪. নবায়নযোগ্য শক্তিতে বৃহৎ আকারে বিনিয়োগ
৫. জ্বালানি-দক্ষ প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা
৬. এলএনজি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো
৭. জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন
বাংলাদেশের গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি আজ ঐতিহাসিক সংকটে। মজুত কমে যাওয়া, নতুন অনুসন্ধানে ব্যর্থতা এবং আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এখনই সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অর্থনীতির জন্য সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।


