সুফি সাগর সামস্

ভোট ও ব্যালটের নির্বাচনী পদ্ধতির প্রকৃতিকে সংক্ষিপ্ত করে দেখলে দেখা যায় যে, এর মূল বিষয়বস্তু হলো তিনটি। এক. সাক্ষ্য প্রদান করা; দুই. সুপারিশ করা এবং তিন. উকিল নিয়োগ করা। সাক্ষ্যপ্রদান করার প্রকৃতি হলো, যে প্রার্থীকে ভোট দেওয়া হয়, তার পক্ষে এই মর্মে সাক্ষী দেওয়া হয় যে, এই প্রার্থী রাজনৈতিক দূরদর্শী, সৎ-শুদ্ধ, নিষ্ঠাবান, জনদরদী, ধার্মিক ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ইত্যাদি। সুপারিশ করার প্রকৃতি হলো, ভোট প্রদানকারী একক ব্যক্তি ব্যাপক জনগোষ্ঠী ও সরকারের কাছে এই মর্মে সুপারিশ করেন যে, নির্বাচনের এই প্রার্থী দেশপ্রেমিক, রাজনৈতিক দূরদর্শী, সৎ-শুদ্ধ, নিষ্ঠাবান, ধার্মিক ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ইত্যাদি। সুতরাং, তাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণে প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার দেওয়া হোক। উকিল নিয়োগ করার প্রকৃতি হলো, ভোট প্রদানকারী সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নে প্রার্থীকে লিগ্যালিটি প্রদান করেন যে, ভোট প্রার্থী ভোট প্রদানকারীদের পক্ষে আইনানুগভাবে জনগণের মৌলিক চাহিদা তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাবেন। সাক্ষ্য, সুপারিশ এবং উকিল নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বিষয়সমূহ একান্তভাবে আবশ্যক তা হলো, যে বিষয়ে সাক্ষ্যপ্রদান করা হবে, সে বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদানকারীকে প্রত্যক্ষদর্শী হতে হবে। অর্থাৎ প্রার্থীর সকল গুণাবলীর বিষয়ে ভোট প্রদানকারীকে নিজ চোখে অবলোকনকারী হতে হবে। সুপারিশ ও উকিল নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই প্রকৃতি হতে হবে। অন্যথায় সাক্ষ্যপ্রদান এবং সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হয় না।
ভোটের বিষয়ে কুরআন মজিদের ‘শাহাদত’ বাক্যের প্রকৃতি একান্তভাবে মনোনীবেশ করা আবশ্যক। শাহাদত তথা সাক্ষ্যদানের যে অর্থ ব্যাপকভাবে কার্যকরী হয়েছে, তা শুধু মামলা-মোকদ্দমা কিংবা কোনো বিচারকের সম্মুখে সাক্ষী দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন মজিদ ও সুন্নাহ’র পরিভাষায় ‘শাহাদত’ বাক্য আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যদি ডাক্তার কোনো রোগীকে সার্টিফিকেট দেয় যে, সে কর্তব্য পালনে কিংবা কাজ করার যোগ্য নয়, তবে এটিও একটি শাহাদত। যদি ওই সার্টিফিকেটে বাস্তব অবস্থার বিপরীতে অন্যকিছু লেখা হয়, তবে তা মিথ্যা সাক্ষ্য হিসেবে কবিরা গুনাহ হবে। পরীক্ষার্থীদের খাতায় নম্বর প্রদান করাও একটি শাহাদত বা সাক্ষ্যপ্রদান ক্রিয়া। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কম-বেশী নম্বর দেওয়া হয়, তবে তাও মিথ্যা সাক্ষ্যপ্রদান বলে গণ্য হবে। ছাত্রদের মধ্যে সনদ বিতরণের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। পরীক্ষায় কৃতকার্য পরীক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করেছে মর্মে সক্ষ্যপ্রদান করা হয়। যদি সনদধারী ব্যক্তি বাস্তবে এরূপ না হয়, তার যদি যথাযথ যোগ্যতা না থাকে, তবে সনদে সাক্ষ্যরদাতা সবাই মিথ্যা সাক্ষ্যদানের জন্য কবিরা গুনাহ’র পাপে পাপী হবে।
এমনিভাবে আইন সভা, কাউন্সিল এবং নির্বাচনে ভোট প্রদান করাও শাহাদত বা সাক্ষ্যদান ক্রিয়া। এতে ভোটদাতার পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দেওয়া হয় যে, ভোটপ্রার্থী যোগ্য, সৎ-শুদ্ধ, ধর্মভীরু, সততা ও বিশ্বস্ততার দিক থেকে জাতির প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্য। কিন্তু দেখা যায় যে, অধিকাংশ মানুষ ভোটের গুরুত্ব অনুধাবন না করে অজ্ঞতাবশতঃ অযোগ্য-অসৎ ব্যক্তিকে ভোট দেওয়ার মধ্য দিয়ে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে কবিরা গুনাহ করেন। কুরআন মজিদের দৃষ্টিতে প্রতিনিধি বা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার তৃতীয় একটি দিক হলো শাফায়াত বা সুপারিশ করা। ভোটদাতা ভোট প্রার্থীকে ভোট দিয়ে সুপারিশ করেন যে, অমুক প্রার্থীকে প্রতিনিধিত্ব প্রদান করা হোক। মহান আল্লাহতা’লা কুরআন-উল-করিমে বলেন :
যে ব্যক্তি উত্তম ও সত্য সুপারিশ করে, যার জন্য সুপারিশ করে, তাকে তার পূণ্য থেকে অংশ দেওয়া হয় এবং যে ব্যক্তি মন্দ ও মিথ্যা সুপারিশ করে, সে তার মন্দ কর্মের অংশ পায় (সূরা নিসা, ৪:৮৫)।
অর্থাৎ প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে যেসব ভালো-মন্দ কাজ করবেন, সেসব কাজের পাপ-পূণ্য ভোট দাতাও সমভাবে পাবেন। প্রার্থী যদি অবৈধ বা পাপ কাজ করেন, তবে তার পাপের প্রাশ্চিত্য ভোটদাতাকেও করতে হবে। শরীয়তের দৃষ্টিতে ভোটের তৃতীয় দিক হচ্ছে ওকালতি করা। অর্থাৎ ভোটদাতা প্রার্থীকে নিজ প্রতিনিধিত্বের জন্য উকিল নিযুক্ত করেন। কিন্তু এই ওকালতি যদি ভোট দাতার ব্যক্তিগত অধিকার সম্পর্কে হত এবং এর লাভ-লোকসান কেবলমাত্র সে একাই পেত, তবে তার জন্য সে নিজেই দায়ী হত। কিন্তু এখানে ব্যাপারটি তেমন নয়। এই ওকালতি সমগ্র জাতির অধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এজন্য কোনো অসৎ-অযোগ্য ব্যক্তিকে স্বীয় প্রতিনিধিত্বের জন্য ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করলে গোটা জাতির অধিকার খর্ব করার পাপ ভোটদাতার উপর বর্তায়।
এক. সাক্ষ্যদান করা, দুই. সুপারিশ করা এবং তিন. সম্মিলিত অধিকার সম্পর্কে ওকালতি করা। এ তিনটি ক্ষেত্রে সৎ, ধর্মভীরু, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট প্রদান করা যেমন বিশাল পূণ্যের কাজ এবং এর সুফল যেমন ভোটদাতা প্রাপ্ত হন, তেমনি অযোগ্য-অসৎ ব্যক্তিকে ভোট (মিথ্যা সাক্ষী) দিয়ে, মন্দ সুপারিশ ও অবৈধ ওকালতির মারাত্মক ফলাফল ভোটদাতার আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হয়। এ কারণে ভোটদানের পূর্বে ভোটপ্রার্থী সংশ্লিষ্ট পদের যোগ্য কিনা এবং সে সৎ ও যোগ্য কিনা, তা যাচাই-বাছাই করে ভোট দেওয়া প্রত্যেকটি ভোটারের ঈমানী দায়িত্ব। আমাদের জনগণের মধ্যে কয়জন এমন আছেন, যাদের বেলায় এ সক্ষ্য সত্য ও বিশুদ্ধ হয়? দুর্ভাগ্যের বিষয় জনগণ নির্বাচনকে একটি হার-জিতের খেলা মনে করে। এ কারণে কখনও টাকার বিনিময়ে ভোটাধিকার বিক্রয় করা হয়। আবার কখনও চাপের মুখে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা হয়। আবার কখনও সাময়িক বন্ধুত্ব ও সস্তা অঙ্গীকারের ভরসায় একে ব্যবহার করা হয়। অনেক শিক্ষত ধার্মিক মুসলমানও অযোগ্য-অসৎ প্রার্থীকে ভোট দিতে গিয়ে চিন্তা করেন না যে, সে মিথ্যা সক্ষ্য দিয়ে খোদায়ী অভিশাপ ও কবিরা গুনাহ্ করছেন। উদাসীনতার বশে অকারণে বিশাল পাপের ভাগী হওয়া উচিৎ নয় (তফসীর মাআরেফুল ক্বোরআন পৃ:৩১৭)।
দেশের কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, তাঁতি, জেলে, মেথর, মুচি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের পক্ষে শহরের উচ্চ সোসাইটিতে বসবাসকারী জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীর সততা, যোগ্যতা ও গুণাবলী যাচাই-বাছাই অথবা নিজ চোখে দেখে ভোট দেওয়া সম্ভব হয় না। তারা প্রার্থীর মিথ্যা গুণকীর্তণ ও প্রার্থীর দেওয়া টাকায় বশীভূত হয়ে এবং প্রার্থীর সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে ভীত হয়ে ভোট দেয়। অর্থাৎ সাক্ষ্য প্রদান এবং সুপারিশ করেন। অতীতে দেখা গেছে যে, অতিরক্ষণশীল পরিবারের সদস্য এবং গ্রামের অশিক্ষিত জনগণ ভোটদান থেকে বিরত থাকতেন। কিন্তু বর্তমানে এর বিপরীতধর্মী বাস্তবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে অনেক উচ্চশিক্ষিত সচেতন ব্যক্তিদের ভোট প্রদান থেকে বিরত থাকতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো, কাকে ভোট দেব? যোগ্য ও সৎ ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হয়নি বা হতে পারেনি। সুতরাং ভোটও দিতে পারছি না। এই শ্রেণির ভোটারদের পরিসংখ্যানের জন্য নির্বাচন কমিশন ‘না’ ভোটের প্রচলন করেছে। অর্থাৎ কোনো ভোটারের বিবেচনায় যদি প্রতীয়মান হয় যে, কোনো যোগ্য ও সৎ ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হয়নি, এমতাবস্থায় তিনি ‘না’ ভোট প্রয়োগ করবেন। ২০০৯ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে না ভোট কাস্ট হয়েছিল ৩ লক্ষ ৮০ হাজার।
যারা ভোট ক্রয় এবং ভোট বিক্রি করে উভয়পক্ষই মিথ্যা সক্ষ্যদান ক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়ে কবিরা গুনাহ্ করেন। একপক্ষ টাকার বিনিময়ে অসৎ ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে মিথ্যা সক্ষ্য দেন আর অপরপক্ষ ভোট ক্রয় করে মিথ্যা সাক্ষ্য আদায় করেন। একপক্ষ ভোট বিক্রি করে অজ্ঞতাবশত আর অন্যপক্ষ ভোট ক্রয় করে ক্ষমতা ও টাকার লালচে। অন্যদিকে যেসব রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচনের দলীয় মনোনয়ন টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেন এবং যারা দলীয় মনোনয়ন ক্রয় করেন উভয়পক্ষই মিথ্যা সাক্ষ্যদান ক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়ে কবিরা গুনাহ্ করেন। একপক্ষ ক্ষমতাসীন হওয়ার লোভে টাকার বিনিময়ে অসৎ ব্যক্তিদের দলীয় মনোনয়ন দিয়ে জনগণকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেন এবং অসৎ ব্যক্তিকে সৎ ব্যক্তি বলে মিথ্যা সাক্ষ্যপ্রদান করেন। অপরপক্ষ অসৎ হওয়া সত্ত্বেও টাকার বিনিময়ে দলীয় মনোনয়ন ক্রয় করে মিথ্যার আশ্রয়ে ভোট ক্রয় করে জনগণকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করে কবিরা গুনাহ্ করেন।
ভোট হচ্ছে ভোটারের বিবেকের রায়। দেশের সংখ্যগরিষ্ঠ ভোটার দরিদ্র এবং অশিক্ষিত। ভোটের গুরুত্ব সম্পর্কে তারা অন্ধ ও অবুঝ। ভোট কি এবং কেন, প্রার্থী সৎ না অসৎ, এই বিবেচনা ও ভালমন্দ যাচাই-বাছাই করে ভোট দেওয়ার অবস্থা তাদের নেই। অসৎ ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া যে কবিরা গুনাহ, তা তারা জানে না। দরিদ্র্যতার কারণে তারা বিবেকহীন। যুবকরা বেকারত্বের যাতনায় টাকার বিনিময়ে মিছিল-সমাবেশে আসেন এবং দরিদ্র ভোটাররা অভাবের তাড়নায় ভোট বিক্রি করেন। অন্যায়ভাবে টাকা নেওয়া যেমন অপরাধ, অন্যায় উদ্দেশ্যে টাকা প্রদান করাও তেমনি অপরাধ। যারা টাকার বিনিময়ে প্রার্থীর পক্ষে মিথ্যা গুণকীর্তণ করার মধ্য দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করেন, ভোট কেন্দ্র দখল করে জোরপূর্বক ভোট কারচুিপ করেন, বোমাবাজি, গোলাগুলি করে জীবনহানী ও নির্বাচনে সহিংসতা ঘটায় এবং তাদেরকে দিয়ে এসব অপরাধ যারা করায়, পবিত্র কুরআন অনুযায়ী সকলেই কবিরা গুনাহ্কারী। একইভাবে টাকার বিনিময়ে দলীয় মনোনয়ন ক্রয়-বিক্রয় এবং ভোট ক্রয়-বিক্রয়কারী উভয়পক্ষই সমভাবে গুনাহ্কারী। গুনাহ্ বা অপরাধ যারা করে, অপরাধ যারা করায় এবং অপরাধ করতে দেখে যারা প্রতিবাদ না করে, তারা প্রত্যেকেই সমানভাবে অপরাধী। ভোট কারচুপির উদ্দেশ্যে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর-যুবকদের প্রাপ্ত বয়স্কের মিথ্যা জন্ম নিবন্ধন সনদ দিয়ে ভোটার করে কবিরা গুনাহ্ করা হয়।
গণতন্ত্রের নামে বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন হয়েছে যে, জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি মূলতঃ রাজনৈতিক দলের মনোনয়নের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। দলের এই মনোনয়ন দলের প্রধানসহ দলের কিছুসংখ্যক ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দের উপর নির্ভরশীল। মনোনয়ন কমিটির লক্ষ্য হলো, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতালাভ করা এবং সরকার গঠন করা। এই কমিটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার চিন্তার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে নির্বাচনী পরিস্থিতি অনুসারে নিশ্চিতভাবে নির্বাচিত হবে এমন ব্যক্তিদেরকেই মনোনীত করেন। এখানে সৎ-শুদ্ধ, জ্ঞানী-গুণি, সমাজের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি কোনো যোগ্যতার মাপকাঠি নয়, যোগ্যতার মাপকাঠি হলো, নির্বাচিত হতে পারা। এই নির্বাচিত হতে পারা, পেশীর জোরেই হোক অথবা বে-আইনীভাবে অর্থ দিয়ে অথবা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যে কোনোভাবেই হোক নির্বাচিত হতে হবে। এই যাতনা থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো সৎ-অসৎ বিচার না করে কালো টাকার মালিক আরাজনৈতিক ব্যক্তিদের জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রদান করেন। রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত হয়ে ওই ব্যক্তি কালো টাকা ও পেশীশক্তি ব্যবহার করে নির্বাচিত হন। নির্বাচনে তারা যে টাকা বিনিয়োগ করেন তার চেয়ে হাজার হাজার গুণ বেশী টাকা নির্বাচিত হয়ে তারা আয় করেন।
জোর যার মুল্লুুক তার। এ প্রথা বহু পুরানো। এই প্রথা বিলুপ্ত হয়নি। বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। প্রচলিত নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার মুখ্য পন্থা হলো, জোর যার মুল্লুক তার চিরাচরিত প্রথা। এ পন্থায় ব্যালট পদ্ধতির এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক না হয়ে, গণবিরোধী গুটিকয়েক রাজনৈতিক নেতার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দ এবং জোর যার মুল্লুক তার প্রথার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই পদ্ধতি সামরিক একনায়কতন্ত্রের মতো দলীয় একনায়কতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পর্যবসিত হয়েছে। দলীয় একনায়কতান্ত্রিক এই পদ্ধতির নির্বাচনে অবাধে প্রার্থী হওয়া এবং নির্বাচিত হওয়ার পথ সম্পূর্ণভাবে রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। মনোনয়ন বাণিজ্যের বিদ্যমান পদ্ধতির নির্বাচিত সরকারেরর প্রশাসনে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপর বে-আইনী হস্তক্ষেপ ইত্যাদি দূরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এসব অশুভ ব্যাধি নিরাময়, সৎ-শুদ্ধ প্রর্থীদের ভোট দিয়ে পুণ্যলাভ এবং অসৎ প্রার্থীদের বর্জন করে কবিরা গুনাহ্ করার পাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই প্রচলিত মনোনয়ন বাণিজ্যের প্রথা বিলুপ্ত করতে হবে।
সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী হওয়ার মতো সমাজের এই এলিট শ্রেণির লোকদের সাথে জনগণের সরাসরি সম্পর্ক বর্তমানে খুবই কম। বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ এবং রাষ্ট্রীয়। ভোটের মাধ্যমে একপক্ষ অপরপক্ষকে আইনানুগভাবে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিয়োগ করেন। এজন্য উভয়পক্ষের মধ্যে এমন সম্পর্ক থাকা আবশ্যক যে, তারা পাশাপাশি ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ সমভাবে ভাগাভাগি করে নেবেন। এখানে বলা যায় যে, একজন সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী হওয়ার মতো ব্যক্তির সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের অভাবেই জনগণের সুখ-দুঃখ তাদের পাশে থেকে তিনি শেয়ার করতে পারেন না। ভালো কথা! সময় সল্পতার কারণে তিনি জনগণের সুখ-দুঃখ শেয়ার করতে পারেন না। কিন্তু সাধারণ খোঁজ-খবর চিনা-জানা তো থাকতেই হবে, তা-না হলে তো প্রতিনিধি হওয়ার ন্যুনতম যোগ্যতাই থাকে না। বাস্তবতা হলো, সাধারণ খোঁজ-খবর থাকা তো দূরের কথা, উভয় পক্ষের মধ্যে মূখ চিনাÑজানাও নেই। সুতরাং যারা না জেনে না চিনে অসৎ প্রার্থীকে ভোট দেয়, তারা মিথ্যা সাক্ষ্যদানের জন্য কবিরা গুনাহ’র অন্তর্ভূক্ত হন। প্রচলিত ভোট ও ব্যলটের নির্বাচনী ব্যবস্থায় দেশের রাষ্ট্রপতি আর সমাজের হতদরিদ্র্য একজন ভিক্ষুকের ভোটের মান সমান। এটা কিভাবে সম্ভব হয়? মহান আল্লাহতা’লাই তো সকলকে সমান ক্ষমতা ও মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করেননি। আমাদের দরিদ্র্য শ্রেণির ভোটাররা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণির ভোট ক্রয় করেই অসৎ ব্যক্তিরা নির্বাচিত হন। এটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটা সূক্ষ্মফাঁক বা ছিদ্রপথ। এই ছিদ্রপথেই সুবিধাবাদী অযোগ্য-অসৎ ব্যক্তিরা নির্বাচিত হন। এই ফাঁক বা ছিদ্রপথ বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়টি নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতে হবে। অন্যথায় দেশের সৎ-শুদ্ধ, দেশপ্রেমীক নেতাদের নির্বাচিত করা যাবে না। প্রকৃত গণতন্ত্র বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব হবে না।
২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বচনের একটি ঘটনার কথা বলা যায়। ঢাকার একটি নির্বাচনী এলাকার ঘটনা। স্বনামধন্য একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান তাঁর দলের এক নেতার সাথে মোবাইল ফোনে নির্বাচনে মনোনয়ন বিষয়ে পরামর্শ করেন। ঢাকার একটি সংসদীয় এলাকায় মনোনয়নের বিষয়ে দলের প্রধান জানতে চান যে, ওই এলাকায় কাকে মনোনয়ন দেয়া যায়? উত্তরে এই নেতা একজন দক্ষ এবং যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য দলের প্রধানকে সুপারিশ করেন। কিন্তু এই যোগ্য ব্যক্তি দলের প্রধানের কাছে রাজনৈতিক বিরাগভাজন ছিলেন। তাই তিনি এ সুপারিশে অখুশি হয়ে কথা শেষ না করেই মোবাইল ফোনের লাইন কেটে দেন। পরের দিন দলের প্রধান আবার ফোন করেন। ফোনে তিনি নির্দেশ দেন যে, ওই সিটে আপনাকে মনোনয়ন দেয়া হলো, আপনি নির্বাচনের জন্য তৈরী হয়ে নেন। জবাবে এই নেতা তাঁর অপারগতার কথা জানান। তিনি বলেন যে, ওই এলাকায় তিনি অপরিচিত, সেখানে কেউ তাঁকে চিনে না, তিনিও সেখানকার কাউকে চিনেন না, এমতাবস্থায় তাঁর পক্ষে সেখানে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। একটি স্বনামধন্য রাজনৈতিক দলের একজন নেতাকে ঢাকার একটি নির্বাচনী এলাকার জনগণ চিনে না, এটা তার জন্য একটি রাজনৈতিক ডিসক্রেডিট। দলের প্রধানের কাছে একথা প্রকাশ পাওয়া নিজের জন্য এক কঠিন দুর্বলতা। কিন্তু তিনি এ সময় নিজের দুর্বলতার কথা না ভেবে, অকপটে নিজের অপারগতার কথা দলের প্রধানের কাছে জানিয়ে দেন। দলের প্রধান তাঁর কথায় কর্ণপাত না করে, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। অগত্যা এই নেতা কি করবেন? তিনি দলের প্রধানের কাছে যে ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেছিলেন, তাঁর সহায়তায় ওই এলাকায় পরিচিতিলাভ করেন এবং নির্বাচন করেন।
মামলা পরিচালনার জন্য যদি অযোগ্য এবং অসৎ উকিল নিয়োগ করা হয়। তবে উকিল সাহেবের অযোগ্যতা এবং অসততার খেসারত বাদী-বিবাদীকেই দিতে হয়। উকিল সাহেবের খেসারতের কিছু নেই। উকিল সাহেব ঠিকই তার টাকা আদায় করে নেন। তদ্রুপ জনগণ যদি কোনো অসৎ ব্যক্তিকে ভোট দেয়, তবে তার খেসারত জনগণকেই দিতে হয়। এখানে মন্ত্রী কিংবা এমপি সাহেবের খেসারতের কিছু নেই। তারা তাদের সকল সুযোগ-সুবিধা নির্বিগ্নে লাভ করে থাকেন। অযোগ্য ও অসৎ ব্যক্তিরা যাতে নির্বাচিত হতে না পারেন, যাতে সকল যোগ্য এবং সৎ-শুদ্ধ ব্যক্তিরা নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে জয়লাভ করতে পারেন, এজন্য একটি জাতীয় সুপ্রীম কাউন্সিল গঠন করতে হবে। এই সুপ্রীম কাউন্সিলের মাধ্যমে সৎ-শুদ্ধ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনের জন্য মনোনীত করতে হবে। মনোনীত ওই সৎ-শুদ্ধ ব্যক্তিদের মধ্য থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত করতে হবে। এভাবে আমাদের নির্বাচনের মধ্যে যে ফাঁক বা ছিদ্রপথ আছে তা বন্ধ করতে হবে। তবেই অধিকতর গণতন্ত্র চর্চা হবে। তবেই প্রচলিত অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রথা দূর হয়ে যোগ্যতার মাপকাঠির গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা প্রতিষ্ঠালাভ করবে। রাজনীতি তখন ব্যক্তি বিশেষের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার না হয়ে জনগণ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রতীকে পরিণত হবে। আর দেশের মানুষ মুক্ত হবে অভিশপ্ত কবিরা গুনাহ’র কবল হতে।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


