ইসতিয়াক মাহমুদ মানিক

এলপিজি সিলিন্ডারের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি কোনো আকস্মিক বাজার বিপর্যয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ধারাবাহিক ফল। সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ২৫৩ টাকার সিলিন্ডার যখন প্রকাশ্যে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়, তখন সেটিকে আর ‘বাজারের সমস্যা’ বলা যায় না—এটি নিঃসন্দেহে প্রশাসনিক অবহেলা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার আত্মসমর্পণ।
প্রশ্ন সোজা—রাষ্ট্র কি কেবল কাগজে কলমে দাম নির্ধারণ করবে, আর মাঠে চলবে ব্যবসায়ীদের ইচ্ছামতো লুণ্ঠন? বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) যে ক্ষমতা নিয়ে গঠিত, সেই ক্ষমতা কি কেবল প্রজ্ঞাপন জারি করতেই সীমাবদ্ধ?
এলপিজি এখন গ্যাস সংযোগহীন মানুষের জন্য কোনো বিকল্প নয়, বরং একমাত্র বাস্তবতা। শহরের বস্তি থেকে মধ্যবিত্তের ভাড়া বাসা—সবখানেই এলপিজির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। সেখানে এই জ্বালানিকে জিম্মি করে মুনাফার খেলা শুরু হওয়া মানে সরাসরি জনগণের ন্যূনতম জীবনযাত্রার অধিকার লঙ্ঘন করা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য—এলসি খোলা যায়নি, ডলার সংকট, আমদানি কমেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাজারে যে সিলিন্ডার এখন বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো কি গতকাল আমদানি করা? নতুন কোনো মূল্যঘোষণা ছাড়া এক লাফে ৫০০–৮০০ টাকা দাম বাড়ানো কি তবে ‘অদৃশ্য হাতের খেলা’, নাকি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের পূর্বপরিকল্পিত কারসাজি?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—এই কারসাজির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। কয়েকটি চিঠি, কিছু মৌখিক সতর্কতা আর দায়সারা অভিযানের আশ্বাস। অথচ আইনে আছে—বাড়তি দাম নিলে জরিমানা, কারাদণ্ড, এমনকি ফৌজদারি মামলা। বাস্তবে কি একটিও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে? হয়নি। কারণ শাস্তিহীনতা এখন আমাদের বাজার ব্যবস্থার অলিখিত নীতি।
বিইআরসি যদি জানত সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে, তাহলে আগাম ব্যবস্থা কোথায় ছিল? কেন আমদানি পরিকল্পনায় বিকল্প পথ রাখা হয়নি? কেন বড় কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট দামে বিক্রির বাধ্যবাধকতা দিয়ে রাষ্ট্রীয় বা আধা-রাষ্ট্রীয় আউটলেট চালু করা হলো না? নাকি এলপিজি বাজারও এখন ‘দেখে নেওয়ার’ তালিকায়?
এই সংকট আরেকটি নির্মম বাস্তবতা সামনে আনে—বাংলাদেশে বাজার কখনোই পুরোপুরি মুক্ত নয়, আবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিতও নয়। এটি আসলে সুবিধাভোগীদের জন্য উন্মুক্ত, আর সাধারণ মানুষের জন্য নির্মম। এখানে সিন্ডিকেটের লাভ নিশ্চিত, কিন্তু ভোক্তার অধিকার অনিশ্চিত।
রাষ্ট্র যখন নীরব থাকে, তখন বাজার হিংস্র হয়ে ওঠে। এলপিজির বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রমাণ। এই নীরবতা ভাঙা না গেলে আগামী দিনে শুধু এলপিজি নয়—বিদ্যুৎ, পানি, নিত্যপণ্য—সবকিছুতেই একই চিত্র দেখা যাবে।
শেষ প্রশ্নটি তাই অনিবার্য—এই দেশ কি ব্যবসায়ীদের জন্য, নাকি নাগরিকদের জন্য? যদি উত্তর হয় নাগরিকদের জন্য, তবে এখনই দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে এলপিজির দামের আগুন শুধু চুলায় নয়, জনমনে আগুন ধরাবে—যার দায় তখন আর কেউ এড়াতে পারবে না।


