বিডিরিপোর্টস ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুদ্ধের পঞ্চম দিনে ইরান একযোগে ইসরায়েল, সৌদি আরব, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা অব্যাহত রেখেছে। ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
মার্কিন ঘাঁটি ও কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস-৪’ অভিযানের অংশ হিসেবে কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থ লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়েছে।
কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সামরিক ঘাঁটি আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত করা হয় এবং অন্যটি ঘাঁটির ভেতরে আঘাত হানে।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট ভবনের কাছে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে থাকা সিআইএর একটি স্টেশন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে।
কুয়েতে ড্রোন ও মিসাইল হামলায় ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
সমুদ্রে সংঘর্ষ ও যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি
আইআরজিসি দাবি করেছে, ভারত মহাসাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় ‘গাদর-৩৮০’ ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ‘তালাইয়ে’ ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট ওই যুদ্ধবিমানটিকে আঘাত করে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ, বৈশ্বিক বাণিজ্যে শঙ্কা
ইরান ঘোষণা দিয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। প্রণালিটি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ওমানের উত্তরে হরমুজ প্রণালিতে একটি কন্টেইনারবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে।
হিজবুল্লাহর হামলা ও ইসরায়েলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া
ইরানসমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের সদরদপ্তর এবং একটি ড্রোন নিয়ন্ত্রণ ঘাঁটি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
জবাবে ইসরায়েল লেবাননের বৈরুত ও বালবেক অঞ্চলে বিমান হামলা চালায়। এতে অন্তত ১০ জন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন প্রদেশে সামরিক ও সরকারি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, এসব হামলায় ইরানের মিসাইল লঞ্চ সাইট, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দাবি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এতে একটি সাবমেরিনসহ ইরানের অন্তত ১৭টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয়েছে।
ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবির ঘটনা
ভারত মহাসাগরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস দেনা’ ডুবে গেছে বলে জানা গেছে। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী জানিয়েছে, জাহাজটিতে থাকা অন্তত ৮০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৩২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবি
ইরানের দাবি, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় প্রথম দুই দিনে ৬৫০ জনের বেশি মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে পিছু হটতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও আইআরজিসি জানিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তাদের হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।
স্থলযুদ্ধের আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকে অবস্থানরত কুর্দি যোদ্ধাদের মাধ্যমে পশ্চিম ইরানে স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরান ইতোমধ্যে কুর্দি ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন হামলা চালিয়ে এ ধরনের সম্ভাব্য অভিযান প্রতিহত করার চেষ্টা করছে।
সংঘাতে নতুন পক্ষ ফ্রান্স
সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে ফ্রান্সও সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ভূমধ্যসাগরে পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি ‘চার্লস দ্য গল’ মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। সাইপ্রাসে ইরানি হামলার পর ইউরোপীয় নিরাপত্তা চুক্তির অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ফরাসি সরকার জানিয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ইঙ্গিত
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এখনো তাদের সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করেনি এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানের পাল্টা আক্রমণের সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসছে।
পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।


