সুফি সাগর সামস্
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী,

বিএনপির চেয়ারপারসন এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রেই শুধু ছিলেন না, বরং দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী রাজনীতির প্রতীক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আপসহীন অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি পরিচিতি পান ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।
শোক থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয় এক অনিশ্চয়তা। সে সময় বিএনপি নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থানরত খালেদা জিয়া তখনো সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। তবে পরিবর্তিত বাস্তবতায় ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন। এ সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে দল ও দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
নেতৃত্বে দ্রুত প্রতিষ্ঠা
রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন এবং একই বছরের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩, ২০০৯ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলেও তিনি চেয়ারপারসনের দায়িত্বে বহাল থাকেন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা
আশির দশকে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ। দলকে সংগঠিত করে তিনি ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ সময় তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়—১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে এবং ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর। তবে এসব গ্রেপ্তার আন্দোলনের গতি থামাতে পারেনি।
১৯৮৭ সাল থেকে ‘এরশাদ হটাও’ আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যান। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
রাষ্ট্রক্ষমতায় তিন মেয়াদ
১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালে জোট সরকারের প্রধান হিসেবে তৃতীয়বার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। তাঁর শাসনামলে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নির্বাচনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো সচল রাখার উদ্যোগ ছিল আলোচনায়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর চেয়ারপারসনের দায়িত্ব তিনি দুইবার পালন করেন। নির্বাচনী রাজনীতিতে তার একটি ব্যতিক্রমী রেকর্ড রয়েছে—পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই জয় লাভ।
ওয়ান ইলেভেন ও কারাবাস
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, যাকে রাজনৈতিক ভাষায় ‘ওয়ান ইলেভেন’ বলা হয়, খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকাকালে তাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা ও চাপের কথা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়। তবে তিনি দেশ ছাড়েননি। পরবর্তী সময়ে সব মামলায় জামিন পান।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মামলা ও উচ্ছেদ
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭টি। এসব মামলায় তিনি টানা প্রায় সাত বছর কারাবন্দি ছিলেন।
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই বাড়িতে তিনি প্রায় ২৮ বছর বসবাস করেছিলেন। বাড়িটি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার তার নামে বরাদ্দ দিয়েছিলেন।
আপসহীন অবস্থান
রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল দৃঢ় ও অনড়। এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ওয়ান ইলেভেন কিংবা পরবর্তী সময়—কারাবাস, মামলা ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও তিনি আপস করেননি। গত দেড় দশকে রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখে পড়লেও তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করেননি।
রাজনৈতিক মূল্যায়ন
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকা। ক্ষমতায় থাকুন বা বিরোধী দলে—তিনি ছিলেন সংগ্রামী রাজনীতির প্রতীক। এ কারণেই দল-মত নির্বিশেষে তিনি শ্রদ্ধা ও আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছেন এক দীর্ঘ লড়াইয়ের নাম—যেখানে আপসহীনতা ও দৃঢ়তাই ছিল তার প্রধান রাজনৈতিক পরিচয়।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যনিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


