
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম পক্ষে ঘোষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন অস্বাভাবিক সংকট, নেতৃত্বশূন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতার এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতরে ও বাইরে—নেতৃত্ব, সংগঠন, নিরাপত্তা ও গণবিশ্বাস—সব ক্ষেত্রেই গভীর প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে। এ কারণে সাধারণ জনগণ, ব্যবসায়ীরা, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক মহল—সকলেই এক ধরনের অপেক্ষা ও উদ্বেগে রয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন-সংকট
দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।
দলের অভ্যন্তরে তাঁর প্রতি আনুগত্য অটুট থাকলেও রাজনৈতিকভাবে তিনি কার্যত অচল অবস্থায়। বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বহীনতা ও দিশাহীনতার দ্বৈত সংকটে অবস্থান করছে।
তারেক রহমানের অনুপস্থিতি ও নিরাপত্তাহীনতা
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছর ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন।
দেশে ফিরে নিরাপদ বোধ করবেন কি না, ভিন্ন কোনো আইনি বা নিরাপত্তাজনিত চাপে পড়বেন কি না—
এসব অনিশ্চয়তা তাঁর প্রত্যাবর্তনকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে দলটি মুখ্য নেতৃত্বহীনতার এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।
নিবেদিত দলগুলোর জন্য আসন বরাদ্দ
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দৃশ্যপটে উঠে আসা ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বিএনপি ২৭টি আসন ছেড়ে দিয়েছে—এটি রাজনীতির নির্বাচনী বড় জোটের ইঙ্গিত দিলেও দলের নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি কমে গেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উত্থান
জামায়াতে ইসলামী মাঠে সক্রিয় নির্বাচনী-প্রচারে সবচেয়ে আগেভাগেই নেমেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনসভা, প্রচার, গ্রাসরুট কর্মসূচি—সব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এটি দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করছে—একদিকে নেতৃত্বহীন বৃহৎ দলগুলোর শূন্যস্থানে তারা জায়গা করে নিচ্ছে, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক উত্তাপ ও মেরুকরণও বাড়াচ্ছে।
আওয়ামী লীগের আত্মগোপনের রাজনীতি
জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় থেকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয় এবং দলটিকে “নিবন্ধনহীন” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় স্তরের বহু নেতা দেশে-বিদেশে আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে—সংগঠনটি অকার্যকর। প্রার্থীদের মাঠে নামানোর প্রস্তুতি অনিশ্চিত। জনসংযোগ কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা সতন্ত্রভাবে অংশ নেবে কি না—তা স্পষ্ট নয়।
জাতীয় পার্টি : বিভক্তি ও আস্থাহীনতা
জাতীয় পার্টি এখন একাধিক উপদলে বিভক্ত। “আওয়ামী দোষর” বা “ক্ষমতাসীন ঘনিষ্ঠ” পরিচয় তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেও কোনো শাখারই স্বাধীন শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সক্ষমতা বর্তমানে স্পষ্ট নয়।
নির্বাচনের রোডম্যাপ : তফসিল ঘোষণার পূর্বমুহূর্তে জটিলতা
সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন শিগগিরই তফসিল ঘোষণার পথে। তবে যেসব কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে—তা হলো :
১. বড় দুই দলের নেতৃত্ব শূন্য বা অনুপস্থিত
২. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাহীনতা
৩. জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা
প্রশ্নগুলো এখন খুব বড়—
-
নির্বাচন কি সময়মতো হবে?
-
হলে তা কি অংশগ্রহণমূলক হবে?
-
অংশগ্রহণ হলেও তা কি প্রতিযোগিতামূলক হবে?
-
যেসব দল কার্যত নেতৃত্বহীন—তারা কি সুষ্ঠুভাবে প্রচারণা চালাতে পারবে?
জনগণের মনস্তত্ত্ব : দিশাহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতা
সাধারণ মানুষ এখন এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতার মাঝে অবস্থান করছে।
-
নেতৃত্ব নেই,
-
দিকনির্দেশনা নেই,
-
স্থিতিশীলতা নেই,
-
নিরাপত্তার গ্যারান্টি নেই।
অনেকে মনে করছেন—নির্বাচনের মতো বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন যদি এমন নেতৃত্ব সংকটে হয়, তাহলে এর গ্রহণযোগ্যতা, স্থায়িত্ব, পরবর্তী সরকার—সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
নির্বাচন সময়মতো—কিন্তু অংশগ্রহণ সীমিত
বড় দলগুলোর নেতৃত্ব অনুপস্থিত থাকলে, ছোট–মাঝারি দল মিলিয়ে নির্বাচন হতে পারে।
তবে এতে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
নির্বাচন স্থগিত বা আংশিক পুনর্গঠন
রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকলে নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে বা অন্তর্বর্তী সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে।
নেতৃত্ব প্রত্যাবর্তন ও হঠাৎ উত্তেজনা
যদি বড় দলের কোনো নেতা আকস্মিকভাবে দেশে ফিরেন বা রাজনৈতিক সমঝোতা হয়, তাহলে ভোটের গতিপথ একেবারে বদলে যেতে পারে। তবে এতে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ কোন পথে?
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে, যেখানে—নির্বাচনের বৈধতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের আস্থা—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে। নেতাহীণতা, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতা—এই তিনের সমন্বয়ে রাজনীতি একটি অগভীর স্রোতে ভাসছে, যার দিক নির্ধারণ এখনো কারও নিয়ন্ত্রণে নেই।
আগামী কয়েক সপ্তাহই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ কি স্বাভাবিক রাজনৈতিক ধারায় ফিরবে, নাকি আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে গড়াবে।
লেখক :
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


