অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবারও আন্তর্জাতিক ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি)-এর সহায়তার দিকে ঝুঁকছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং সার আমদানির জন্য সংস্থাটির কাছ থেকে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ।
সৌদি আরবের জেদ্দায় ২১ থেকে ২৪ জুন অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক অর্থায়ন পরিকল্পনা সভায় এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র বলছে, বৈঠকে বাংলাদেশ ও আইটিএফসির মধ্যে চূড়ান্ত অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ করা হতে পারে।
জ্বালানি খাতেই সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন
সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, মোট অর্থায়নের বড় অংশই যাবে জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ২ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলার, পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানির জন্য ৬০০ মিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সার আমদানির জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চাইবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে বিপিসি আগের তুলনায় বেশি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। চলতি অর্থবছরে তাদের চাহিদা ছিল ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৭০০ মিলিয়ন ডলার ছাড় হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আগামী অর্থবছরে আমদানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
হরমুজ সংকট বাড়াচ্ছে এলএনজি ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বিদ্যমান চুক্তির আওতায় অনুমোদিত ৬০০ মিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থায়ন ব্যবহার করতে চায় তারা।
এছাড়া কাতারএনার্জি, ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড এবং এক্সিলারেট গ্যাস মার্কেটিং লিমিটেড পার্টনারশিপসহ কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করায় বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
সার আমদানিতে শর্ত শিথিল চায় বাংলাদেশ
খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে সার আমদানির ক্ষেত্রেও আইটিএফসির সহায়তা অব্যাহত রাখতে চায় সরকার। তবে অর্থায়নের শর্ত শিথিল করার দাবি জানিয়েছে বিএডিসি।
বর্তমানে কিছু অর্থায়ন নির্দিষ্ট দেশ থেকে সার আমদানির সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিএডিসি চায়, ভবিষ্যতের অর্থায়ন চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বাধ্যবাধকতা না রেখে বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে সার আমদানির সুযোগ রাখা হোক।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার মধ্যে আমদানি উৎস বৈচিত্র্য করার সুযোগ থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
বাড়তে পারে অর্থায়নের সীমা
বাংলাদেশ সরকার আইটিএফসির কাছে মোট অর্থায়নের সীমা ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, আমদানি চাহিদা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থা নিরাপদ রাখতে অতিরিক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন।
আইটিএফসি জানিয়েছে, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদার আইটিএফসি
সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক আইটিএফসি ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি) গ্রুপের একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানিতে অর্থায়ন দিয়ে আসছে সংস্থাটি।
২০০৮ সাল থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইটিএফসি প্রায় ২১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ আবুধাবির এডিএনওসি থেকে মুরবান ক্রুড এবং সৌদি আরবের আরামকো থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড আমদানি করে, যার অর্থ পরিশোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে আইটিএফসির অর্থায়ন।
সামনে কী?
জেদ্দার আসন্ন বৈঠক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকট এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আইটিএফসির সহায়তা অব্যাহত রাখা এখন শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজনই নয়, বরং দেশের জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার কৌশলগত অপরিহার্যতা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।


