বিশেষ প্রতিবেদন

ঢাকা, ২৫ মার্চ ২০২৬ – বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় আজ নতুন আলো পাচ্ছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি, ভোটার অধিকার হরণ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দেশের সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সেই সময়ে সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ সামনে থাকলেও মূল অপারেশনাল কমান্ড ও গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন তখনকার ৯ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ওপর চাপ
ওই দিনে বঙ্গবন্ধু ভবনে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে জিম্মি করার ঘটনায় মাসুদের নাম অন্যতম। তার কৌশল এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করার পদ্ধতি ছিল সংবিধান লঙ্ঘনের সীমারেখা অতিক্রম করা। এক-এগারোর সেই অভ্যুত্থান রক্তপাতহীন হলেও জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে অচল করার একটি সুগভীর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হয়।
জাতীয় সমন্বয় কমিটি: নির্যাতনের কেন্দ্র
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সবচেয়ে বিতর্কিত দায়িত্ব ছিল ‘গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’। দুর্নীতি ও অপরাধ দমনকে অজুহাত বানিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের আটক ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে কারাগারে পাঠিয়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ প্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিলেন।
তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা তারেক রহমান ও তার ভাই আরাফাত রহমান কোকো এই সময়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। রিম্যান্ডের নামে তারেককে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে মারার ঘটনা তার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। দীর্ঘ নির্বাসনের মধ্য দিয়ে তিনি মুক্তি পান, কিন্তু সেই আঘাত আজও বহন করছেন।
সুবিধাবাদী রাজনীতিক ও ক্ষমতার খেলা
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী শুধু নিষ্ঠুরই ছিলেন না, বরং চরম সুবিধাবাদীও। ওয়ান-ইলেভেনের সরকার বিদায়ের আগে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন আঁতাত করেন এবং পরে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি জাতীয় পার্টির ব্যানারে ফেনী-৩ আসন থেকে দুইবার এমপি হন, যেখানে জনভিত্তি তার ছিল না; বলা হয় ব্যালট বাক্স আগেই তার পক্ষে ভরাট করা হত।
শিক্ষা: ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়
মাসুদের গ্রেপ্তার বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা:
- অন্যায় ক্ষমতা টেকসই নয় – রাষ্ট্রের শীর্ষে থাকলেও জনগণের ওপর অন্যায় করলে তার মাশুল দিতে হবে।
- সেনাবাহিনীকে রাজনীতিকরণ বিপজ্জনক – ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষে বাহিনী ব্যবহার করলে অসম্মানজনক পরিণতি আসে।
- বিচারের সময় বিলম্বিত হলেও আসে – ১৫ বছরের চাপে আজ ন্যায়বিচার শুরু হয়েছে।
বর্তমান ও ভবিষ্যতের বার্তা
ডিআইজি শফিকুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, মাসুদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে হত্যা, নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। জনগণ আশা করছে এই বিচার কেবল নাটক নয়, বরং দেশের সকল প্রভাবশালীকে আইনের আওতায় আনা হবে।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পতন প্রমাণ করে – যাদের অহংকার অসীম, তাদের শেষ ঠিকানা হয় অন্ধকার কারাগার ও ইতিহাসের ঘৃণা। আজকের বাংলাদেশে আইন ও ন্যায়ের শাসনই মূল বার্তা।


