বিশেষ প্রতিবেদন

দেশে জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় কঠোর অবস্থানে গেছে সরকার। কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুত ও চোরাচালান ঠেকাতে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। অভিযানে ইতোমধ্যে তেলের অবৈধ মজুতের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ, ডিপোগুলোতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী মোতায়েনসহ বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
ট্যাগ অফিসারদের দায়িত্ব: সরাসরি নজরদারিতে তেল সরবরাহ
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে নিয়োজিত ‘ট্যাগ অফিসার’রা দৈনিক তেলের মজুত ও সরবরাহ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।
তাদের মূল দায়িত্বগুলো হলো:
- প্রতিদিন প্রারম্ভিক তেলের মজুত রেকর্ড করা
- ডিপো থেকে সরবরাহকৃত তেল সরাসরি উপস্থিত থেকে গ্রহণ ও পরিমাপ করা
- পে-অর্ডার, চালান ও সরবরাহের পরিমাণ মিলিয়ে দেখা
- ডিপ-রড/ডিপ স্টিকের মাধ্যমে বাস্তব মজুত যাচাই
- ফিলিং স্টেশনের রেজিস্টারে হিসাব সংরক্ষণ ও মনিটরিং
- দিনে অন্তত তিনবার (সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা) স্টক আপডেট নিশ্চিত করা
সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অবৈধ মজুত বা কারসাজি কমবে।
পাম্প সংকট: বাড়াতে হবে ফিলিং স্টেশনের সংখ্যা
রাজধানী ঢাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল চালক—বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং চালকদের ভিড়ে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে,
“শুধু মোটরসাইকেলের চাহিদা মেটাতেই ঢাকায় অন্তত ২০টি নতুন পাম্প প্রয়োজন।”
সিএনজি সংকটের কারণে অনেক যানবাহন তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় চাপ আরও বেড়েছে।
এদিকে যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন,
- দীর্ঘদিন ধরে নতুন পাম্পের লাইসেন্স বন্ধ রয়েছে
- যানবাহনের তুলনায় জ্বালানির জোগান অপর্যাপ্ত
- প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালু করা জরুরি
উত্তরাঞ্চলে সরবরাহ বন্ধ: শ্রমিক ধর্মঘটে স্থবিরতা
জ্বালানি তেল সরবরাহে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে উত্তরাঞ্চলে। রংপুর বিভাগের আট জেলায় ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে তেল উত্তোলন ও সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ থাকায় পুরো অঞ্চলে সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতিও শ্রমিকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
সরকারি ডিপোতেই অবৈধ মজুত: অভিযানেই উন্মোচন
বিশেষ অভিযানের মধ্যেই সরকারি পর্যায়ে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনে অভিযান চালিয়ে হিসাবের বাইরে গোপনে মজুত করা ১২,৬১৩ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ওই ডিপো থেকে আপাতত তেল সরবরাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
নিরাপত্তা জোরদার: ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন
তেল চোরাচালান ও অবৈধ মজুত ঠেকাতে দেশের ৯টি জেলার ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এতে সরবরাহ চেইনে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং তেল পাচার রোধে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সার্বিক চিত্র
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার একদিকে কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জোরদার করেছে, অন্যদিকে সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা—যেমন পাম্পের স্বল্পতা, বিতরণে অদক্ষতা এবং শ্রমিক অসন্তোষ—সমাধানের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
- সরবরাহ ব্যবস্থার ডিজিটাল ট্র্যাকিং
- নতুন ফিলিং স্টেশন স্থাপন
- নীতিগত সমন্বয়
—এই তিনটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে জ্বালানি খাতে চলমান সংকট অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।


