বিশেষ প্রতিবেদন

দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। স্তন, ফুসফুস, জরায়ুমুখ, লিভার, মুখগহ্বর, খাদ্যনালি, পাকস্থলী ও রক্তের ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন হাজারো মানুষ। তবে রোগের ভয়াবহতার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এবং সীমিত চিকিৎসা অবকাঠামো। চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমি বিক্রি, ঋণগ্রস্ত হওয়া কিংবা সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে অসংখ্য পরিবার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক ব্যবহার, খাদ্যে ভেজাল, দূষিত পরিবেশ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও বিভিন্ন সংক্রমণের কারণে দেশে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি আগের তুলনায় রোগ নির্ণয় সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন আক্রান্তের প্রকৃত চিত্রও বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।
হাসপাতালের সামনে দীর্ঘ অপেক্ষা
রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রেডিওথেরাপি নেওয়ার জন্য রোগীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অনেক রোগী তিন থেকে চার মাসের আগে চিকিৎসার সিরিয়াল পাচ্ছেন না।
ফরিদপুরের ৫২ বছর বয়সী সালমা বেগম মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন রাজধানীতে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন জর্দা, সুপারি, গুল ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের কারণেই তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন।
সালমা বেগম বলেন,
“বহু বছর ধরে পান-জর্দা খাই। ডাক্তার নিষেধ করেছেন। কিন্তু নেশা ছাড়তে পারিনি। এখন রেডিওথেরাপির জন্য চার মাস পরের সিরিয়াল দিয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। সিরিয়াল আসা পর্যন্ত বাঁচব কি না জানি না।”
এমন বাস্তবতা শুধু সালমা বেগমের নয়; দেশের হাজারো ক্যানসার রোগীর একই চিত্র।
বছরে দেড় লাখের বেশি নতুন রোগী
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হন। বছরে ক্যানসারে মৃত্যু হয় ১ লাখেরও বেশি মানুষের।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন,
“পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, মুখগহ্বর ও লিভার ক্যানসার বেশি দেখা যায়। নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রকোপ বেশি। শিশুদের মধ্যেও ব্লাড ক্যানসারসহ নানা ধরনের ক্যানসার বাড়ছে।”
তামাকই বড় ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ক্যানসার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ তামাক ব্যবহার। ধূমপান ছাড়াও জর্দা, গুল, সাদাপাতা, সুপারি ও অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাকও ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন,
“তামাক ব্যবহারের কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ফুসফুস ও মুখগহ্বরের ক্যানসারসহ নানা রোগে মানুষ মারা যাচ্ছে। তামাকের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা।”
তিনি আরও বলেন,
“তরুণ প্রজন্মকে তামাকের করালগ্রাস থেকে রক্ষা করতে তামাকপণ্যের ওপর উচ্চ হারে কর আরোপ এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন জরুরি। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগের বোঝা ভয়াবহ আকার নেবে।”
চিকিৎসা ব্যয়ে মধ্যবিত্তও দিশেহারা
ক্যানসার চিকিৎসা এখন দেশের অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই বহন করতে হচ্ছে রোগীর পরিবারকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়—
- একটি পরিবারের গড়ে মাসিক চিকিৎসা ব্যয় ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা
- দরিদ্র পরিবারগুলোর মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় হয়
- শহরে গড়ে চিকিৎসা ব্যয় ৪ হাজার ১৯২ টাকা, গ্রামে ৩ হাজার ১০৯ টাকা
- ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর হাসপাতালে চিকিৎসায় গড়ে ব্যয় হয় প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় ওষুধ, রোগ নির্ণয় পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার ও শয্যা ভাড়ায়।
চিকিৎসা চালাতে ঋণ ও সম্পদ বিক্রি
গত বছর প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ফর ইকুয়িলিটি ইন হেলথ-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়াবহ আর্থিক চিত্র। গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীদের বার্ষিক চিকিৎসা ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের মোট আয়ের দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী—
- প্রায় ৭৮ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার জন্য ঋণ নেয়
- ৪০ শতাংশ পরিবার সম্পদ বা জমি বিক্রি করে
- প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় ভাঙা বা আত্মীয়স্বজনের সহায়তার ওপর নির্ভর করে
ফলে চিকিৎসা চালাতে গিয়ে বহু পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
অবকাঠামো সংকট তীব্র
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি হাসপাতাল, রেডিওথেরাপি মেশিন কিংবা প্রশিক্ষিত জনবল। ফলে রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে পারছেন না। অনেকেই চিকিৎসার মাঝপথে অর্থাভাবে থেমে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
কী করা জরুরি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন—
- তামাকপণ্যের ওপর উচ্চ কর ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ
- জেলা পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসা সম্প্রসারণ
- সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপি মেশিন বৃদ্ধি
- সাশ্রয়ী ক্যানসার ওষুধ নিশ্চিত করা
- প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্তে স্ক্রিনিং বাড়ানো
- স্বাস্থ্যবিমা চালু ও দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি
- খাদ্যে ভেজাল ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা
সামনে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশে ক্যানসার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। জনস্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি এটি বড় অর্থনৈতিক চাপেও পরিণত হবে।
ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রয়োজন সচেতনতা, দ্রুত শনাক্তকরণ, সহজলভ্য চিকিৎসা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


