বিশেষ প্রতিবেদক

গণ-অভ্যুত্থানের পর পতন হওয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একের পর এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অনেকগুলোরই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার রাজধানীর সাত সরকারি কলেজকে একীভূত করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ (ডিসিইউ) নামে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ জারি করে।
শিক্ষাবিদদের একাংশ বলছেন, এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার একটি কাঠামোগত সমাধান হতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, অন্তত এক হাজার কোটি টাকার আর্থিক দায় নতুন সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে—যার বাস্তবায়ন সহজ নয়।
সাত কলেজ সংকটের পটভূমি
২০১৭ সালে রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধিভুক্ত করা হয়। কলেজগুলো হলো—
-
ঢাকা কলেজ
-
ইডেন মহিলা কলেজ
-
বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ
-
শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ
-
কবি নজরুল সরকারি কলেজ
-
সরকারি বাঙলা কলেজ
-
সরকারি তিতুমীর কলেজ
পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই এই সংযুক্তির ফলে তৈরি হয় প্রশাসনিক ও একাডেমিক জটিলতা। শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করা হয়। এর পরই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অধ্যাদেশ ও প্রশাসনিক কাঠামো
গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ জারি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে থাকবে—
-
কলা, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন, চারুকলা এবং অন্যান্য ‘স্কুল’
-
আচার্য, উপাচার্য, সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিলসহ পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো
-
অনুষদের বদলে ‘স্কুল’ পদ্ধতি
-
অধিভুক্তির বদলে ‘সংযুক্ত’ কলেজ ব্যবস্থা
এই কাঠামো অনেকটাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এর আদলে, যদিও ভাষাগত ও কাঠামোগত কিছু পার্থক্য রাখা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা: হাজার কোটির প্রশ্ন
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে অন্তত ১,০০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। সদ্য বদলি হওয়া এক শিক্ষাসচিব চলতি অর্থবছরেই অন্য খাত থেকে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের চেষ্টা করছিলেন, এবং পরবর্তী অর্থবছরে বড় প্রকল্পের মাধ্যমে আরও অর্থ জোগাড়ের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক রদবদলের ফলে সেই প্রক্রিয়া থেমে আছে।
ফলে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস মো. আবদুল হাছিব কার্যত ভাসমান অবস্থায় আছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এক লাখ শিক্ষার্থীর তাৎক্ষণিক চাপ
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত শূন্য থেকে অবকাঠামো গড়ে তুলে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। কিন্তু ডিসিইউ শুরুতেই প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থীর একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে।
গত শিক্ষাবর্ষে সাত কলেজে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তি কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়টি দ্রুত কার্যকর না হলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরিচয় ও সনদ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন,
“যেখানে বিদ্যমান শিক্ষক ও অবকাঠামো দিয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা চালানোই কষ্টকর, সেখানে মান নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।”
মান নিয়ন্ত্রণ ও র্যাংকিং বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর মতো প্রাচীন প্রতিষ্ঠানও আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি করতে হিমশিম খাচ্ছে। সে তুলনায় নবগঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জাতীয় মানে পৌঁছাতেও দীর্ঘ সময় লাগা স্বাভাবিক।
আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে মূল ক্যাম্পাস শক্তিশালী হয়ে উঠলে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা অবহেলার শিকার হতে পারেন—যেমন অভিজ্ঞতা অতীতে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোয় দেখা গেছে।
সামনে কোন পথ?
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—
সম্ভাবনা আছে:
-
রাজধানীর কলেজ শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা
-
স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে মানোন্নয়ন
-
দীর্ঘমেয়াদে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় নতুন দিগন্ত
চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট:
-
বিপুল অর্থের জোগান
-
প্রশাসনিক দক্ষতা
-
মান নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন
-
শিক্ষার্থীদের আস্থার সংকট
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি—এটি কি কেবল আরেকটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, নাকি রাজধানীর কলেজ শিক্ষাব্যবস্থায় টেকসই সংস্কারের সুযোগ?
উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের ওপর। সঠিক পরিকল্পনা ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন ছাড়া হাজার কোটির এই প্রকল্প নতুন সরকারের জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে। আর সফল হলে—এটি হতে পারে রাজধানীর উচ্চশিক্ষায় একটি কাঠামোগত রূপান্তরের সূচনা।


