মোঃ খুরশীদ আলম সরকার

রাজধানীর মিরপুরের প্যারিস রোডে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল কংক্রিটের কাঠামো—স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘ভূতুড়ে মার্কেট’। প্রায় ২৮ বছর ধরে নির্মাণ অসমাপ্ত এই ভবন এখন মাদক, জুয়া ও নানা অপরাধের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এখান থেকে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের পর নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছরে এই ভবন থেকে আটটির বেশি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বশেষ ১৬ জানুয়ারি রাতে দুর্গন্ধের সূত্র ধরে মার্কেটের নিচতলা থেকে সুমন নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে আটক করা হয়েছে।
গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, ছয়তলাবিশিষ্ট ভবনটির অবস্থা করুণ। দেওয়ালে শ্যাওলা জমেছে, খসে পড়ছে পলেস্তারা। পশ্চিম পাশের একটি অংশ দখল করে গড়ে উঠেছে বস্তি। নিচতলায় সারি করে রাখা রিকশা ও ভ্যানের ফাঁকে সুনসান নীরবতা। দিনের আলোতেও ভিতরে প্রবেশ করলে গা শিউরে ওঠে। বাতাসে ভেসে আসে মাদকের গন্ধ, চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ফেনসিডিলের বোতল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে-রাতে এখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে, চলে জুয়া খেলা। ছিনতাইকারী ও অপরাধীরা পরিকল্পনা ও ভাগবাঁটোয়ারার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে ভবনটিকে। সময়মতো মার্কেট চালু না হওয়ায় জায়গার বড় একটি অংশ দখল হয়ে গেছে বলেও জানান তারা।
দুই একর জমির ওপর নির্মিত এই ভবনে ডিএনসিসির ব্যয় হয়েছে অন্তত ২৫ কোটি টাকা। অথচ জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য শত কোটি টাকার বেশি। ১৯৯৬ সালে নির্মাণ শুরু হলেও সরকার পরিবর্তন, মেয়র বদল ও সিটি করপোরেশন বিভক্তির জটিলতায় কাজ আর শেষ হয়নি। সে সময় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ২ হাজার ৩৬৩টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খালেক এন্টারপ্রাইজ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পালিয়ে যায় বলে জানা গেছে।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর জাহান বলেন, “মার্কেটটি দ্রুত চালু করার জন্য আমরা সিটি করপোরেশনকে চিঠি লিখব। এটি চালু হলে অপরাধের ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।”
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে এমন একটি পরিত্যক্ত ভবন শুধু জননিরাপত্তার ঝুঁকি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ভয়াবহ অপচয়। দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়ে নির্মাণ শেষ করে এটি বাণিজ্যিক কার্যক্রমে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। নইলে ‘ভূতুড়ে মার্কেট’ নামের এই অবকাঠামো আরও দীর্ঘদিন অপরাধের প্রতীক হয়েই থেকে যাবে।


