সুফি সাগর সামস্

১৫৬৮ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর খালি পায়ে ভিক্ষুকের মত আগ্রা থেকে আজমীর গিয়েছিলেন। প্রায় ২০০ মাইল উত্তপ্ত মরুভূমি, কঙ্করময় পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে তিনি যখন আজমীর পৌঁছেন তখন তার পা ফুলে গিয়েছিল। ক্ষত-বিক্ষত হয়ে রক্ত ঝড়ছিল। মরুভূমির উত্তপ্ত লু হাওয়ায় তার শরীরের চামড়া পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছিল। তিনি যখন আজমীরে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র) এর মাজার শরীফে উপস্থিত হন তখন সত্যিকার অর্থে তাঁকে একজন ফকিরের মতোই দেখাচ্ছিল। তার পোশাক ছিড়ে গিয়েছিল। ময়লা ঘাম ও দুর্গন্ধে তিনি একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গী সাথী শত শত আমীর-ওমরা এবং হাজার হাজার সৈন্য ভিক্ষুকের মত তার সঙ্গী হয়েছিল।
এ সময় মাজারের খাদেম ছিলেন হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র) এর নাতি হযরত সেলিম চিশতি (র)। যে দেহে বইছিল চেঙ্গিস খাঁ, তৈমুর লং এবং বাবরের রক্ত। যে তলোয়ার হিন্দুস্তানকে পদানত করে রেখেছিল, সেই তলোয়ারের মালিক সম্রাট আকবর সত্যিকার ভিক্ষুকের মত হযরত সেলিম চিশতি (র) এর পায়ের ওপর আছড়ে পড়েছিলেন। উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর কাছে সন্তান কামনা। সন্তান প্রাপ্তির সুসংবাদ উচ্চারণ না করা পর্যন্ত সম্রাট আকবর সেলিম চিশতি (র) এর পা ছাড়েননি। তিনি যখন জাহাঙ্গীরের জন্মের সুসংবাদের আশ্বাস প্রদান করেন তখন সম্রাট আকবর ওঠে দাঁড়ান। তখনও সম্রাটের শরীর কাঁপছিল। চোখে তখনো অশ্রুধারা বইছিল। অশ্রুচোখেই সম্রাট পুনরায় খালি পায়ে ভিক্ষুকের মতো রাজধানীর পথে রওয়ানা দিয়েছিলেন।
একইভাবে ২০০ মাইল মরুপথ অতিক্রম করে তিনি যখন রাজপ্রাসাদে ফিরলেন তখন কেউ তাকে চিনতে পারছিল না। অত:পর ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ সেপ্টেম্বর শাহজাদা নূরুদ্দিন মুহম্মদ জাহাঙ্গীর জন্মগ্রহণ করেন। সেলিম চিশতির দু’য়ার-বরকতেই সম্রাট জাহাঙ্গীর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এ জন্য সম্রাট আকবর জাহাঙ্গীরের ডাক নাম রেখেছিলেন সেলিম।
সুতরাং মহানবী (স) এর পরিবারের ১০তম পুরুষ হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশ্তি (র)-কে নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতে হবে। ভারতবর্ষের আলেম-উলামাদেরকে তাঁকে বিশেষভাবে চিনতে হবে। তাঁর তরিকা সম্পর্কে জানতে হবে। তিনি ছিলেন চিশতিয়া তরিকার ইমাম। চিশতিয়া তরিকা থেকেই “সাবরিয়া” তরিকা সৃষ্টি হয়েছে। সাবরিয়া তরিকার ইমাম হলেন সৈয়দ আলাউদ্দিন আল সাবের কালিয়ার (র)। বাংলাদেশে বরিশাল জেলার চরমোনাই দরবার শরীফ সাবরিয়া তরিকা অবলম্বনে প্রতিষ্ঠিত। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশ্তি (র) কিভাবে ভারতবর্ষে কি উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলেন তা বিশেষভাবে জানতে হবে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদি, শিখসহ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে কামার-কুমার মেথর-মুচিসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর দরবারে আসেন এবং তাদের মনের বাসনা পূর্ণ করেন।
লেখক :
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি ও
মানবিক নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপকার।


