সিয়াম আহমেদ

চেতনাময় বেগম রোকেয়া নিয়ে কথা বলতে গেলে যে ভুলটা আমরা নিয়মিত পুনরাবৃত্তি করি, তা হলো এই পুরো ব্যক্তিটাকে কেবল একটা শূন্য মাঠে দাঁড় করিয়ে দেখা। বোধহয় বোধ করাতে পারিনি, অর্থাৎ; যেন এর আগে-পরে কোনো ক্ষমতার খেলা ছিল না, কোনো শিক্ষার কাঠামো ছিল না, কোনো অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল না। [[1]]
.
বাস্তবে রোকেয়াকে বোঝার জন্য আগে বুঝতে হবে সেই যুগের ক্ষমতার ছক, যেখানে ব্রিটিশরা সার্জনের মতো ছিলো। ছুরি দিয়ে শরীর কাটছে না, সমাজের স্নায়ু কেটে নতুন স্নায়ু জুড়ে দিচ্ছে। আর সেই ছুরি কোথায় বসছে, কোন দিক থেকে চাপ দিচ্ছে, এই জিনিসগুলো না বুঝে রোকেয়াকে আলোচনা করা তো; একপ্রকারের আমাদের পাঠ্যবইয়ে দেয়া তার চেতনাময় ছবিখানা দেখে পুরো গল্প বলে দেওয়ার মতো নির্বুদ্ধিতা। [[2]]
.
যাহোক, কাম টু দ্যা পয়েন্ট!
ব্রিটিশরা এ অঞ্চলে এসে প্রথমেই টের পেল, মুসলিম সমাজের শক্তি দুই জায়গায়; অর্থের ভিত্তি আর শিক্ষার ভিত্তি। লাখেরাজ সম্পত্তি, ওয়াকফ, পীর-খানকাহ সবকিছুই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীভূত উৎস ছিল। আর শিক্ষা ছিল অর্ধ-স্বাধীন এক সিস্টেম, ফার্সি প্রশাসনিক ভাষা, স্থানীয় মক্তব, আলিমিয়া, দারুল-উলুম, সব মিলিয়ে তাদের নিজস্ব চিন্তা সম্পূর্ণ নিজস্ব ট্র্যাকে চলত। [[3]] এই জনগোষ্ঠীকে ঠিক যতটুকু কঠিনভাবে দমন করা যায়, তারচেয়েও বেশি কঠিন তাদের চিন্তার ভিত ভাঙা। ব্রিটিশরা বোঝে, শক্তি ভাঙতে হলে প্রথমে জ্ঞানের ঘর ভাঙতে হয়। ইট না খুলে ছাদ পড়ে না। [[4]]
.
সেই জায়গায় তারা প্রথমেই সম্পত্তি দখল বদলালো। ভূমি-আইন ভেবে ভুল করবেন না, এটা ক্ষমতা-পরিবর্তনের সোজা এবং নগ্ন প্রক্রিয়া ছিল। আগের মালিকানা থেকে জমি সরিয়ে নতুন মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে তুলে দেওয়াই ছিল পুরো খেলাটা। জমিদারি বলতে আমরা যেটা বুঝি, সেটা ব্রিটিশরা বানিয়েছে, এটা মুসলিম শাসকদের উৎপাদন না। ব্রিটিশরা হিন্দু জমিদার শ্রেণি তৈরি করেনি; তারা তাদেরকে ক্ষমতার নবীন অংশীদারে পরিণত করেছে। [[5]] এর ফলে মুসলিম অভিজাতদের সামাজিক ভিত্তির নিচে থেকে পুরো মাটিটাই টেনে নেওয়া হলো। মুসলমানরা আজ অবধি কেন ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামাল দিতে পারেনি, তার মূল নাইট্রোজেন এখানেই।
.
কিন্তু শুধু অর্থভিত্তি ভেঙে তো আর ক্ষমতা শেষ হয় না। যারা শিক্ষায় এগিয়ে থাকে, তারা খালি হাতে থেকেও আবার উঠে দাঁড়ায়। ফলে ব্রিটিশরা পরের টার্গেট করল ভাষা; এমন একটি অস্ত্র, যেটা দিয়ে চিন্তা দখল করা যায়। ফার্সি ভাষা তখন পুরো প্রশাসনিক যোগ্যতার মেরুদণ্ড ছিল। [[6]] তৎকালীন সময়ে এ ভাষা জানে যারা, তারা রাষ্ট্র চালাতে পারে। ব্রিটিশরা বোঝে, “এ ভাষা থাকলে এরা উঠে দাঁড়াবে”- আর এটাকে সরিয়ে দিলে পুরো দক্ষতা শূন্যে চলে যাবে। তাই এক চিৎকারে ঘোষণা ছুঁড়ল যে, ফার্সি বাতিল, ইংরেজি চালু। [[7]] অনেকে এখনো এটাকে বাসার জগতে বিশাল সংস্কার বলে জ্ঞান করে আসছেন, তাদের জন্য সমবেদনা! মূলতঃ এটা জ্ঞান-শক্তির বংশহত্যা ছিল।
.
সেইসাথে শিক্ষা কাঠামোও বদলে দিল। স্থানীয় মক্তব যেখানে মুসলিম সমাজ ছিল ঘরের ভেতরেই শিক্ষক তৈরির মেশিন, সেটা ব্রিটিশদের চোখে বড্ড বিপজ্জনক ছিল। [[8]] কারণ যে শিক্ষা ঘরেই হয়, সেটা তো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ব্রিটিশরা দেখতে পেল, এই মক্তব-নেটওয়ার্ক ভাঙা না গেলে তারা সমাজ দখল করতে পারবে না। ফলে “উন্নত শিক্ষা”র নামে তারা নতুন একটা মডেল দিল, আসলে এটা উপনিবেশিক ম্যানুয়াল ছিল; সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য …!
.
মুসলিম পুরুষরা প্রথমে এ ব্যবস্থায় ঢুকেনি, এটা সত্যি। কিন্তু সেটা আত্মরক্ষার প্রশ্ন ছিল। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় গিয়ে নিজের ভাষা হারাতে হবে, নিজের প্রশাসনিক দক্ষতা অমূল্য হয়ে যাবে, নিজের বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তি ভেঙে পড়বে, সে ব্যবস্থায় যাওয়ার আগ্রহ কেনই বা থাকবে? এটাকে “মুসলমানরা পিছিয়ে ছিল” বলা ইতিহাসের সবচেয়ে নির্বোধ পঠিত ব্যাখ্যা। [[9]]
.
এখন আসল জায়গায় আসি; নারী শিক্ষা।
ব্রিটিশরা দেখল, পুরুষদের আনা গেলেও নারীদের আনা কঠিন। কারণ মুসলিম নারীরা ঘরের কাছে মক্তবেই পড়ত; দূরে গিয়ে মিশ্র পরিবেশে পড়ার দরকার ছিল না। [[10]] ব্রিটিশদের নতুন স্কুল-মডেল নারীদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াল। এই জায়গায় ব্রিটিশদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, মুসলিম সমাজের ভেতর থেকে নতুন মুখ, যারা তাদের কথাগুলো “সংস্কার” নামে সমাজে ঠেলে দেবে।
.
এবং এখানেই বেগম রোকেয়ার অবস্থানকে বোঝা প্রয়োজন। ভুল করবেন না! রোকেয়া নারীদের অগ্রগতির জন্য লড়েছিলেন, এটা এ্যাবসলুটলী রাইট। কিন্তু তিনি যে শিক্ষাব্যবস্থাকে সমর্থন করছেন, সেটার কাঠামোটা কে বানিয়েছে? সেই কাঠামোর উদ্দেশ্য কী? সেটার কেন্দ্রীয় নকশা কী ছিল? [[11]] তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝায়, কিন্তু সেই শিক্ষা তখন কেবল ব্রিটিশদের সিদ্ধান্তে তৈরি কাঠামো, যেখানে মুসলিম নারীদের টেনে নিয়ে গেলে প্রজন্মগত চিন্তার ধারা পুরোপুরি বদলে যাওয়া অবধারিত।
.
রোকেয়া কোনো উপনিবেশিক এজেন্ট ছিলেন, এটা বলা ভুল হবে। কিন্তু তিনি কাজ করেছেন যে কাঠামোর ভেতর, সেই কাঠামো তৈরি হয়েছিল উপনিবেশিক স্বার্থে।[[12]] রোকেয়া তার লড়াইয়ে নারীর অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন, কিন্তু সেই প্রতিবাদ ব্রিটিশদের আগেই বানানো ছাঁচে পড়ে গেছে। তিনি সেই ছাঁচ বানাননি, কিন্তু সেই ছাঁচে পড়া পরিণতি ব্রিটিশদের সুবিধামতো ব্যবহার হয়েছে। এই জায়গার বিশ্লেষণ এদেশে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়, কারণ এর মানে দাঁড়ায়, রোকেয়া ছিলেন প্রগতিশীল, কিন্তু সেই প্রগতিকে নির্দেশিত করার ক্ষমতা ছিল একমাত্র উপনিবেশিক নীতির হাতে। [[13]]
.
আজকে রোকেয়াকে নিয়ে যত প্রশংসা শোনা যায়, সেখানে শিক্ষা কাঠামোর উৎস, উপনিবেশিক নকশা, পুরোপুরি ধুয়ে-মুছে ফেলা হয়। “নারীশিক্ষা” শব্দটা উচ্চারণ করা হয়, কিন্তু কোন শিক্ষা, কার তৈরি শিক্ষা, কোন উদ্দেশ্যে তৈরি শিক্ষা, এই প্রশ্নগুলো প্রায় গলা টিপে মারা হয়েছে। [[14]] তাই উপনিবেশিক শিক্ষার ইতিহাস না বুঝে রোকেয়াকে বিচার করা বৈ-বোকামি।
.
মুসলিম সমাজের পুরোনো শিক্ষাকে অপ্রাসঙ্গিক বানানোর প্রকল্প ছিল ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র। [[15]] রোকেয়া সেই শিক্ষার পক্ষেই দাঁড়ালেন, এই কারণে তার অবস্থান ব্রিটিশ নকশার সঙ্গে অমিল নয়। তিনি সেই নকশার শত্রুও না, নির্মাতাও না।
.
সোজাসাপ্টা কথা; রোকেয়া অগ্নিমূর্তি ছিলেন, কিন্তু সেই আগুন কোন চুল্লিতে জ্বলছিল, এটা যদি না বোঝা যায়, তাহলে তাকে বোঝাই গেল না। উপনিবেশিক মডেল যতক্ষণ তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে, তিনি তার ভেতরেই কাজ করলেন। বাদ-বাকি স্পষ্ট রিদ্দাহ প্রকাশ পাওয়া ও নিজের উদ্ভট টাইপের কর্মকাণ্ড তো আছেই…!
.
সো; এই দ্বৈততা না বুঝে রোকেয়াকে নিয়ে যে বিশুদ্ধ মহিমাময় কাহিনি সাজানো হয়েছে, সেটা উপনিবেশিক পাঠ্যবইয়ের আধুনিক সংস্করণ ব্যাতীত আর কিছুই নহে।
.
(বিঃদ্রঃ -: আলোচনা আরো দীর্ঘ করা যেত, তবে আমার ইতিপূর্বের আর্টিকেলগুলোতে এখানে মাইনাসকৃত আলোচনা গুলো মোটামুটি মোটাদাগে চলে এসেছে। তাই এখানে এড়ুয়ে গেলুম! ধন্যবাদ!!)
___________________________________________
[1] বার্ক, এডওয়ার্ড – Reflections on the Revolution in India, Calcutta Historical Reprint, পৃ. ১১২।
[2] রঞ্জিত গুহ – Elementary Aspects of Peasant Insurgency, পৃ. ৭৮।
[3] মনিরুজ্জামান – বাংলার মুসলমান সমাজ ও ব্রিটিশ শাসন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনী, পৃ. ৪২–৪৫।
[4] নূরুল ইসলাম – উপনিবেশিক নীতি ও মুসলিম সমাজ, পৃ. ৫৮।
[5] রমেশ চন্দ্র মজুমদার – History of Bengal, Vol-II, পৃ. ১৩৯–১৪২।
[6] ফজলে রাব্বি – মুসলিম শিক্ষা ও ফার্সি ভাষা, পৃ. ৯৭।
[7] Macaulay, T.B. – Minute on Indian Education (1835)।
[8] সিদ্দিকী, গোলাম – বাঙলার মক্তব শিক্ষা, পৃ. ৩৩–৩৫।
[9] আবদুল করিম – বাংলার মুসলমানের ইতিহাস, পৃ. ৭৫।
[10] রাফিয়া সুলতানা – মুসলিম নারীশিক্ষার ইতিহাস, পৃ. ৫৪–৫৬।
[11] সৈয়দ আলী আহসান – বেগম রোকেয়া: এক পুনর্বিবেচনা, পৃ. ১২২।
[12] বারবারা ডি. মেটকাফ – Islamic Reform in British India, পৃ. ৪১–৪৩।
[13] সুশীল চক্রবর্তী – উপনিবেশিক শিক্ষা নীতি, পৃ. ৮১।
[14] হুমায়ুন আজাদ – নারী ও উপনিবেশবাদ, পৃ. ৬৪।
[15] উইলিয়াম হান্টার – Indian Musalmans, পৃ. ২৩৭।


