শনিবার, আগস্ট ৮, ২০২৬

বিচারের আগেই শাস্তি? দুদক আইন সংশোধন, সম্পদ জব্দ ও বিনিয়োগ সংকট

পাঠক প্রিয়

বিশেষ প্রতিবেদন

ঢাকা: কোনো ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তার ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ ক্রোক কিংবা বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা—এসব পদক্ষেপ কি আইনের শাসন ও সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন সংশোধন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ এবং তার বাস্তব প্রয়োগ।

আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, অপরাধ প্রমাণের আগেই নাগরিকের মৌলিক অধিকার সীমিত করা হলে তা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। অন্যদিকে দুর্নীতি ও অর্থপাচার রোধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা।

অধ্যাদেশের উত্থান ও বিলুপ্তি

গত বছরের শেষ দিকে দুদক আইন সংশোধনের জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সংশোধিত বিধানে তদন্ত চলাকালীন সময়ে ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ ক্রোক এবং বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মতো ক্ষমতা সম্প্রসারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

পরবর্তীতে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি উত্থাপন করা হলেও তা আইনে রূপান্তরিত হয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন না পাওয়ায় অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায় এবং পূর্ববর্তী দুদক আইন পুনরায় কার্যকর হয়।

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেওয়া অতিরিক্ত ক্ষমতাগুলোর কিছু বিষয় মৌলিক অধিকার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল।

কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা?

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, সংশোধিত ব্যবস্থার আওতায় প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন প্রায় এক হাজার ব্যক্তি। একই সঙ্গে কয়েক দশ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ক্রোকের আওতায় এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমালোচকদের দাবি, এসব পদক্ষেপের অনেকগুলোই তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছে, ফলে নিরপরাধ ব্যক্তিরাও ভোগান্তির শিকার হতে পারেন।

অর্থনীতিতে প্রভাব নিয়ে বিতর্ক

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একাংশের অভিযোগ, ব্যাংক হিসাব জব্দ ও বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতার মুখে পড়েন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যবসায়িক আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়লে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে অন্য একাংশের মত হলো, দুর্নীতি ও অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির আরও বড় ক্ষতি হতে পারে।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অভিযোগ

ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে। সমালোচকদের দাবি, যেসব ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছিল তাদের অনেকেই ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে পারেননি, ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ সুদহার, ডলার সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনে কী আছে?

ভারত, পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যের দুর্নীতিবিরোধী আইন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে তদন্ত চলাকালে সম্পদ জব্দ বা লেনদেন সীমিত করার ব্যবস্থা থাকলেও তা সাধারণত আদালতের তত্ত্বাবধান বা নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সীমিত করার ক্ষেত্রে বিচারিক নজরদারি, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং আপিলের সুযোগ রাখা হয়।

সংবিধান ও বিদেশ ভ্রমণের অধিকার

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে দেশের ভেতরে চলাফেরা এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও পুনঃপ্রবেশের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যদিও জনস্বার্থে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে।

আইনজ্ঞদের মতে, বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারণ, সময়সীমা এবং বিচারিক পর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠতে পারে।

সামনে কী করণীয়?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি দমন ও অর্থপাচার রোধে রাষ্ট্রকে অবশ্যই শক্তিশালী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সেই ব্যবস্থাগুলো যেন সংবিধান, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

তাদের মতে, ভবিষ্যতে যেকোনো দুর্নীতিবিরোধী আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রে আদালতের তত্ত্বাবধান, নির্দিষ্ট সময়সীমা, স্বচ্ছতা এবং নাগরিকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অন্যায্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি করছেন, তাদের অভিযোগও আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার—উভয়ই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কতটা গ্রহণযোগ্য, সেই বিতর্ক আগামী দিনেও নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

সর্বশেষ সংবাদ

‘সার্ভিস’ শব্দের বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু কী মানুষের মুক্তি ঘটেছে?

সুফি সাগর সামস্ ভাষা, ক্ষমতা ও মানবমর্যাদা নিয়ে একটি পুনর্বিবেচনা সভ্যতার ইতিহাসে শব্দ কখনো কেবল শব্দ নয়; তারা একটি যুগের সামাজিক...

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ, জরুরি সংবাদ সম্মেলন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, শুক্রবার: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন জাতীয় সংসদের...

মানবমস্তিষ্ক: মহাবিশ্বের ভেতর আরেক মহাবিশ্ব

সুফি সাগর সামস্ মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি কি কোনো নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা কৃষ্ণগহ্বর? হয়তো নয়। হয়তো সবচেয়ে বিস্ময়কর কাঠামো হলো মানবমস্তিষ্ক—কারণ এই ক্ষুদ্র জৈবিক অঙ্গই সমগ্র মহাবিশ্বকে...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেলে স্বাধীনতার মূল্যবোধও হারাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা না গেলে একসময় স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধও হারিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ...

এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না : ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে...

জনপ্রিয় সংবাদ