সৈয়দ ইরফানুল বারী

চরটির নাম ভুলে গেছি! একটি বাড়ী দেখিয়ে মওলানা সাহেব মাঝিকে বললেন, এখানে রাখ। উপুড় হয়ে ঝুপড়িটিতে আমরা ঢুকলাম। মওলানা জিজ্ঞেস করলেন, কিরে আসিরুদ্দীন ফকির, কেমন আছিস। ফকির পদচুম্বন করতে করতে বললেন, “হুজুর আল্লাহ বেশ ভাল রেখেছেন। খুব ভাল আছি।”
পানি থেকে আড়াই কি তিন হাত উঁচু একটা ছাপড়া-মাচা বাঁধা। এতেই আসির ফকির থাকে। তার ভাষায় সে খুব ভাল আছে। কলার ভেলায় বসে আমরা আলাপ করছিলাম। মওলানা জিজ্ঞেস করলেন, “ কি খেয়ে বেঁচে আছিস?” জবাব এল, “এই তো গলা গজাইয়া আছে পাট গাছ। তারই পাতা আটার ফেনে গুইলা সিদ্ধ করি আর খাই।” ইতিমধ্যে নজরানা স্বরূপ সে মওলানা সাহেবকে দশ পাইয়ের একটি মুদ্রা দিল। নির্বিকার চিত্তে তিনি পকেটে রেখে দিলেন। আমার জন্যে তাজ্জব হওয়া ছাড়া আর কি করার ছিল! তারপর ফকির বলল, “হুজুর, আমরা তো গরীব, এইই ভাল আছি। কিন্তু আমার কষ্ট লাগে শহরের ধনী মাইনষের লাগি। এইবার তো আনাইস তরকারী সব ভাইসা গেল। সায়েবরা খাইব কি!” মওলানা বললেন, “দেখ বারী, তাদেরও প্রশস্ত হৃদয় আছে, এদেরও গভীর মানব-প্রেম আছে।”
মওলানা সাহেব আবার কথার জের টানলেন, “তোর না শহরের প্রতি খুব রাগ। বেটারে পড়তে দিলি। আর তোর অপছন্দের একটা বউ ঘরে আনল। আচ্ছা, বউটারে কি করেছিস?”
দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে ফকির বলল, “না হুজুর, বেয়াদব বউ ঘরে নিই ক্যামনে। সিরাজগঞ্জেই ছেলেটে বউ নিয়া থাকে।”
কথায় কথায় অনেক কথা জানলাম। ফকির বহু কষ্টে একমাত্র ছেলেকে পি, টি পাশ করাল। প্রাইমারী পাশ একটি বউ নিয়ে সে বাড়ী ফিরল। এতে ফকিরের মোটেই আপত্তি ছিলনা। কিন্তু বউ যে জুতা পড়ে। এখানেই তার ঘোর বিপত্তি বাধল। এজন্যে সন্তোষে এসেও ফকির দরবার করে গেছে। স্বয়ং হুজুর রায় দিয়েছেন, বউ জুতা পরতে পারে। কিন্তু ফকিরের বিদ্রোহ থামল না। একমাত্র পুত্রবধু নিয়ে অবশেষে সে সংসার করতে পারল না। বউ নিয়ে ছেলে চলে গেছে। ফকির হার মানে নি।
মওলানার অনশনের প্রসঙ্গে যে কথা লিখতে আসির ফকীরের দরবারে হাজির হলাম তা এখনো বলিনি। ফকীরের সাথে আমি অনেক আলাপ করলাম। লোকটা বিচিত্র, আরো বিচিত্র তার ধ্যান ধারণা। নিরক্ষর হলেও সে মূর্খ নয়। মাঝে মাঝে অতি উঁচু দরের কথাও বলছিল। একবার আমাকে জিজ্ঞেস করে বসল, “আচ্ছা, আপনারাও হুজুরের রাজনীতির খুব ভক্ত। তিনি যে এই বুড়া বয়সে না খাইয়া তিন দিন রইলেন, আপনারা ছয়দিন থাকলেন না ক্যান?” আমি যখন চুপ থাকলাম সে আবার বলে চলল, “আমরা এই চৌহদ্দির মানুষ হুজুরের এই কথা শুইনা তিনদিন রোজা রাখছি। এমনিতেই তো আমরার দিন যায় রোজায় রোজায়। তবু নিয়তটা তো আসল, কি বলেন!”
চারাবাড়ী ঘাটের কয়েকজন ব্যবসায়ী মুরীদ মওলানা সাহেবকে ৪০/৫০ টাকা নজর দিয়েছিল। তা থেকে তিনি দশটি টাকা আসির ফকীরকে দিলেন। এবার বুঝলাম, দশ পাইয়ের মর্ম। তোমার ভালবাসা তা যে প্রকৃতিতেই আসুক, আমার দোয়ার খোলা। আর আমার দায়িত্ব , তা যত সীমিত থাকুক তাও অবারিত।
রওনা হবার আগে ফকীর সাধলেন, একটু ফেন খাবেন?


