ইব্রাহিম খলিল বাদল

জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। এমন সময় অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় ঘনিয়ে এলেও বড় অঙ্কের চুক্তি, কেনাকাটা ও নতুন প্রকল্প অনুমোদনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টি ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্ক।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নির্বাচনের ঠিক আগে সরকার একাধিক দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের ওপর বড় দায় তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
তফসিলের পরও মেগা প্রকল্প অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সাধারণত সরকারের রুটিন কাজ করার কথা থাকলেও এবার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে বড় ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদন, আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় সিদ্ধান্তের কারণে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি ও গোপন শর্ত নিয়ে বিতর্ক
নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নন-ডিসক্লোজার চুক্তির কারণে শর্তাবলি প্রকাশ না হওয়ায় ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ঠিক আগে এই ধরনের ‘গোপন ট্যারিফ চুক্তি’ স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব চুক্তি সম্পন্ন করা হচ্ছে ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারকে চাপমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে।
বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনা: বড় আর্থিক দায়ের আশঙ্কা
সরকার বোয়িং থেকে নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিভিন্ন সূত্র মতে, ১৪ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনায় ৩০–৩৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় আর্থিক প্রতিশ্রুতি নির্বাচনের আগে নেওয়া হলে নতুন সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষর ও আন্তর্জাতিক প্রকল্প: বাড়ছে সমালোচনা
বন্দর ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তিও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না থাকায় সমালোচনা বাড়ছে।
একাধিক বিশ্লেষক মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল কাজ ছিল নির্বাচন আয়োজন ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। কিন্তু শেষ সময়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ‘নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ’ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় প্রকল্প, আন্তর্জাতিক চুক্তি, সম্ভাব্য পে-স্কেল ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ—সব মিলিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখে পড়তে পারে।
তাদের মতে, নির্বাচনের আগে নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ সরকারের নীতিনির্ধারণের সুযোগ সীমিত করতে পারে।
সরকারের অবস্থান
সরকারের দাবি, চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম থামিয়ে রাখলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জরুরি প্রকল্প ও কৌশলগত চুক্তিগুলো সম্পন্ন করা হচ্ছে।
আগামী জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর পর নির্বাচিত সরকারের কাছে দ্রুত দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা জানিয়েছে সরকার।
নির্বাচনের আগে বড় প্রকল্প, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও উচ্চ ব্যয়ের সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে এসব সিদ্ধান্তের আর্থিক ও নীতিগত প্রভাবই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


