বিশেষ প্রতিনিধি

গত ১৬ মাসে বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতিজগৎ মব সন্ত্রাসের কারণে বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে। কনসার্ট, সাংস্কৃতিক উৎসব বন্ধ হচ্ছে, বাউল ও অন্যান্য শিল্পীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে, মাজারে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে, এবং আক্রান্তরা বিচার পায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঐতিহ্যবাহী ছায়ানট ও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর ওপর হামলা। ১৮ ডিসেম্বর ওসমান হাদির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা এবং অগ্নিসংযোগ চালানো হয়। একই সময় ধানমন্ডিতে অবস্থিত ছায়ানট ভবনও ভাঙচুরের শিকার হয়। পরদিন ১৯ ডিসেম্বর উদীচীর কার্যালয়েও আগুন লাগানো হয়। ছায়ানট ও উদীচী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অগ্রগামী দুই সংগঠন। দেশের সাংস্কৃতিক নবজাগরণ এবং প্রগতিশীল আন্দোলনে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে বাউল শিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ৪ নভেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওরে একটি পালাগানের আসরে বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আটক করে পুলিশ। পরেরদিন তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এর পর ভক্তরা মানববন্ধন করেন, এবং একই সময়ে ‘জেলার সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও তৌহিদি জনতা’ ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় মিছিলকারীরা বাউলশিল্পী ও ভক্তদের ওপর হামলা চালায়, চারজন আহত হন।
ঠাকুরগাঁওয়ে বাউল সাধকের ওপর হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত কর্মসূচিতেও ‘তৌহিদি জনতা’ নামে একটি গোষ্ঠীর বাধার কারণে তিনজন বাউল আহত হন। এছাড়া, মব সন্ত্রাসের কারণে ফরিদপুরে জেমসের কনসার্ট বাতিল করতে বাধ্য হতে হয়। টাঙ্গাইলের মধুপুরে লালন স্মরণোৎসব, নারায়ণগঞ্জে ‘মহতি সাধুসঙ্গ ও লালন মেলা’, ঢাকার বিভিন্ন নাট্য ও বসন্ত উৎসবও বাধার মুখে বন্ধ হয়েছে।
সংস্কৃতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, একদল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হুমকি ও বাধার কারণে শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চা প্রায়শই বন্ধ হচ্ছে। এটি শিল্পী ও সংগঠকদের মধ্যে আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য হুমকি এবং সরকারের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সাংস্কৃতিক কর্মীরা সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে শিল্পী ও সাধারণ মানুষ নিরাপদে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন এবং সংস্কৃতির ক্ষতি রোধ করা যায়।


