অনলাইন ডেস্ক

নিজের মুদি দোকান থাকা সত্ত্বেও মিরপুরের বাসিন্দা খলিলুর রহমান তার একমাত্র কন্যাশিশুর জন্য উন্নত মানের ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে খাদ্যদ্রব্য কিনে থাকেন। তার বিশ্বাস, দাম একটু বেশি হলেও নামী ব্র্যান্ডের পণ্য শিশুদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর। একই বিশ্বাস নিয়ে পরীবাগের বাসিন্দা সালেহা চৌধুরীও সন্তানের জন্য বেশি দামের ব্র্যান্ড বেছে নেন। কিন্তু সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য—‘ভালো ব্র্যান্ড’ নামেও বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে ভেজাল ও মানহীন শিশুখাদ্য।
বিশেষ করে গুঁড়া দুধ, চকলেটসহ নানা শিশুখাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যাচ্ছে। যেসব পণ্য চোখ বন্ধ করে শিশুদের জন্য কিনছেন অভিভাবকরা, সেসব পণ্যেই মিলছে ভেজাল। বাচ্চাদের প্রিয় গুঁড়া দুধ তৈরি হচ্ছে তথাকথিত ‘হয়ে পাউডার’ দিয়ে, যেখানে প্রকৃত দুগ্ধ উপাদানের পরিমাণ অত্যন্ত কম।
গুঁড়া দুধে মাত্র ১৭ শতাংশ দুগ্ধ উপাদান
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের খাদ্য পরিদর্শকরা ‘গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার’-এর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, এতে দুগ্ধ উপাদান রয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। বাকি প্রায় ৬৭ শতাংশই ভেজাল উপাদান।
দুগ্ধ চর্বি থাকার কথা ছিল ৪২ শতাংশের কাছাকাছি, কিন্তু পাওয়া গেছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। প্রোটিন থাকার কথা ছিল কমপক্ষে ৩৪ শতাংশ, অথচ মিলেছে মাত্র ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ পণ্যটির বড় অংশই মানহীন ও ক্ষতিকর উপাদানে ভরা।
এ ঘটনায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত গোয়ালিনী গুঁড়া দুধ বাজার থেকে প্রত্যাহার ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেন। এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। পরে তিনি দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ভেজাল পণ্য তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
বিদেশি ও নামী ব্র্যান্ডেও ভেজাল
শুধু দেশীয় পণ্য নয়, বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যেও ভেজাল ধরা পড়ছে। তদন্তে আসলাম টি কোম্পানির ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার, ডানো, ড্যানিশ, নেসলে ও স্টারশিপসহ একাধিক গুঁড়া দুধ ল্যাব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। এসব পণ্যের আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।
এমনকি জনপ্রিয় কিটক্যাট চকলেটেও ক্ষতিকর উপাদান পাওয়ায় আদালতে মামলা হয়েছে। রাজধানীর ফকিরাপুল থেকে সংগ্রহ করা কিটক্যাট পরীক্ষায় মানহীন প্রমাণিত হয়।
বিএসটিআই লোগো নিয়েও প্রতারণা
বাজারে থাকা অনেক ভেজাল পণ্যের মোড়কে দেখা যাচ্ছে বিএসটিআই লোগো ও কিউআর কোড। তবে বিএসটিআই কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো নকল। গ্রাহকদের কিউআর কোড স্ক্যান করে পণ্য নিবন্ধিত কি না যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শিশুস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের উপপরিচালক ডা. মো. আকতার ইমাম বলেন, ভেজাল খাদ্যে শিশুদের কিডনি সমস্যা, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা, এমনকি ব্রেন ডেভেলপমেন্টে গুরুতর সমস্যা হতে পারে। এসব ক্ষতি অনেক সময় স্থায়ী হয়ে যায়।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া বলেন, শিশু খাদ্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় নিয়মিত বাজার তদারকি ও ল্যাব পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে জনবল ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে সব ক্ষেত্রেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, সচেতনতার বিকল্প নেই
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ না হওয়ায় ভেজালকারীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এই অনিয়ম বন্ধ হবে না।
এদিকে অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সন্দেহজনক পণ্য দেখলে প্রশাসনকে জানানো এবং বিএসটিআই নিবন্ধন যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার ও কঠোর আইন প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।


