ইব্রাহিম খলিল বাদল

চিকিৎসা নয়—এটি যেন এক সুসংগঠিত ব্যবসায়িক কারখানা। রোগীর সেবার বদলে শোষণ, শিক্ষার বদলে সার্টিফিকেট বাণিজ্য এবং মানবিকতার বদলে রাজনৈতিক প্রভাব—এই তিনের ভয়ংকর সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কাগজে-কলমে এটি একটি আধুনিক হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ; বাস্তবে এটি ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার এক জীবন্ত উদাহরণ।
সেবার প্লেটে তেলাপোকা, পচা ডিমে বানানো খাবার
যে হাসপাতালে মানুষ সুস্থ হতে আসে, সেই হাসপাতালের ক্যান্টিনে খাবারের সঙ্গে নিয়মিত পরিবেশন করা হচ্ছে তেলাপোকা ও মশামাছি। অভিযোগ রয়েছে—কেক ও বিস্কুট তৈরিতে ব্যবহৃত হয় পচা ডিম। রোগীর স্বজনরা বলছেন,
“এই খাবার খেলে রোগী তো দূরের কথা, সুস্থ মানুষও হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাবে।”
অভিযোগ জানানো হলেও কর্তৃপক্ষের নীরবতা প্রমাণ করে—এখানে রোগীর স্বাস্থ্য নয়, লাভই শেষ কথা।
এক বছর ধরে বেতনহীন চিকিৎসা সেবা!
হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বড় একটি অংশ গত এক বছর ধরে নিয়মিত বেতন পাননি। অথচ রোগীদের কাছ থেকে চিকিৎসার নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন,
“বেতন চাইলে চাকরি হারানোর হুমকি আসে। আমরা কার্যত জিম্মি।”
বেতন না দিয়ে চিকিৎসা করানো হচ্ছে—এটাই কি আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার মানদণ্ড?
কাগজে ৭৫০ শয্যা, বাস্তবে ১৪৫—এই প্রতারণার হিসাব দেবে কে?
সরকারি নথিতে হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৭৫০। বাস্তবে সেখানে রয়েছে মাত্র ১৪৫টি বেড। প্রশ্ন উঠছে—এই ভুয়া তথ্যে কারা চোখ বুজে অনুমোদন দিল? নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কী করছিল?
এই তথ্য গোপন রেখে বছরের পর বছর লাইসেন্স ও অনুমোদন বহাল রাখা নিছক অবহেলা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ভয়াবহ ব্যর্থতা।
মেডিকেল কলেজ নয়, সার্টিফিকেট কারখানা?
মেডিকেল শিক্ষায় প্রতি পাঁচজন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক বাধ্যতামূলক। কিন্তু আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজে অধিকাংশ বিভাগেই শিক্ষক নেই, ল্যাব নেই, শ্রেণিকক্ষ নেই। নেই পর্যাপ্ত বই, লাইব্রেরিতে বসার জায়গা পর্যন্ত নেই।
তারপরও কীভাবে প্রতিবছর আসন বাড়ানো হয়?
কার অনুমতিতে এই মেডিকেল কলেজ ভবিষ্যতের চিকিৎসক তৈরি করছে?
জমি নেই, দলিল নেই—তবু চলছে কলেজ!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শন ও ডিনস কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—কলেজ ও হাসপাতালের নামে নিজস্ব জমি নেই। ৮৬.৮৫ কাঠা জমির যে দাবি করা হয়, তার নিবন্ধনের সার্টিফাইড কপি জমা দেওয়া হয়নি। আরও ৭০ শতাংশ জমি কেনার নির্দেশ উপেক্ষা করা হয়েছে বছরের পর বছর।
তাহলে প্রশ্ন একটাই—কোন জাদুবলে এতসব অনিয়মের পরও এই কলেজ টিকে আছে?
হাজার কোটি টাকার ঋণ, বিদেশে পাচারের অভিযোগ
২০১৮ সালে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে নৌকা প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আনোয়ার হোসেন খান। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেন।
এই অর্থের একাংশ শেয়ারবাজারে কারসাজি, আরেক অংশ বিদেশে পাচার এবং বাকি অংশ দিয়ে দেশে বিপুল সম্পত্তি কেনার অভিযোগ রয়েছে। এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পরও তদন্ত কোথায়?
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দায়মুক্তির উৎসব
যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, তার সঙ্গে ‘সুসম্পর্ক’ গড়ে তোলাই আনোয়ার হোসেন খানের কৌশল—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ব্যাংকিং খাতের এতগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিরব দর্শকের ভূমিকায়।
এই নীরবতা প্রশ্ন তোলে—দেশে কি প্রভাবশালীদের জন্য আলাদা আইন আছে?
শেষ প্রশ্ন: রোগী, শিক্ষার্থী ও রাষ্ট্রের জবাব কে দেবে?
একটি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ যদি এভাবে প্রতারণা, শোষণ ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়, তবে দায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—দায় রাষ্ট্রেরও।
এই অনিয়মের তদন্ত হবে কবে?
কারা জবাবদিহির আওতায় আসবে?
আর কতদিন ‘সেবার নামে বাণিজ্য’ চলবে রাজনৈতিক আশ্রয়ে?


