নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগর এলাকায় গুলি চালানো হয়েছে। হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। আহত শরিফকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক পদক্ষেপ:
ঘটনার পর থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ডিবি পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে হামলাকারীদের ধরতে তৎপর। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এক সন্দেহভাজনের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। ডিএমপি জনসাধারণকে অনুরোধ করেছে, ছবির ব্যক্তির বিষয়ে যেকোনো তথ্য থাকলে জানানোর জন্য। এছাড়া, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।
হামলাকারীর প্রাথমিক শনাক্তকরণ:
ডিবি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারী একজনের নাম ফয়সাল করিম মাসুদ, ওরফে রাহুল বা দাউদ খান। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কেশবপুরের হুমায়ুন করিমের ছেলে ফয়সাল। তিনি রাজধানীর আদাবরের পিসিকালচার সোসাইটির ৯ নম্বর রোডে ভাড়া বাসায় ছিলেন। ফয়সাল নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সদস্য নির্বাচিত হন।
ফয়সাল করিম ২০২৪ সালের নভেম্বরে রাজধানীর আদাবর এলাকায় অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুট ও ডাকাতির ঘটনায় র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন। সেই সময় তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ৫টি গুলি, তিনটি মোবাইল ফোন ও ৫ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। হাই কোর্ট ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে জামিন দেন। এছাড়া, সম্প্রতি হাদির সঙ্গে ঢাকা-৮ আসনে গণসংযোগ এবং ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে অংশ নেওয়ার ছবি ভাইরাল হয়েছে। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, ফয়সাল বেশ কিছুদিন ধরেই হাদিকে অনুসরণ করছিলেন।
অপর হামলাকারী ও তদন্তের অবস্থা:
হামলায় অংশ নেওয়া অপরজনকে এখনো সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা যায়নি। তবে সম্ভাব্য তিনজন যুবকের ছবি নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে। “টাওয়ার ডাম্পিং” পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেটের সূত্র ধরে একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, শুটার ও বাইক চালানো যুবক সীমান্ত অঞ্চলের দিকে পালানোর চেষ্টা করতে পারে। এজন্য বিজিবি সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে।
পুলিশি প্রতিক্রিয়া ও অভিযান:
ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার অভিযান অত্যন্ত স্পর্শকাতর। প্রাথমিকভাবে অনেককে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে আসল হামলাকারীরাও থাকতে পারে। মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন শিকদার জানিয়েছেন, ডিবির বিভিন্ন টিম অভিযানে রয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে দ্রুততম সময়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
জনমনে প্রশ্ন ও রাজনৈতিক প্রভাব:
গোলযোগপূর্ণ এই হামলায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—কারা এবং কী উদ্দেশ্যে শরিফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করেছেন। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, এটি রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়েছে। তবে আসামি গ্রেপ্তারের পরই নেপথ্যের আসল কারণ জানা যাবে।
চিকিৎসা ও বর্তমান অবস্থা:
হাদির অবস্থা বর্তমানে সংকটাপন্ন। এভারকেয়ার হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের থানায় উপস্থিত হতে বলা হয়েছে যাতে মামলা প্রক্রিয়া এগোতে পারে।
হামলাকারীদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ফয়সাল করিম মাসুদ প্রাথমিকভাবে শুটার হিসেবে শনাক্ত হলেও অপরজন ও সম্পূর্ণ নেপথ্য রাজনীতিক উদ্দেশ্য এখনো রহস্যময়। এই ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে, এবং জনগণ তৎপরতার সঙ্গে মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে।


