ইব্রাহিম খলিল বাদল

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলা—স্থানীয়ভাবে পরিচিত সারপিন টিলা—এখন আর সবুজ টিলা নয়, রূপ নিয়েছে বিশাল গর্তে। দিনের আলোতে শতাধিক ‘বোমা’ মেশিনের বিকট শব্দে কাঁপে এলাকা, আর রাতের আঁধারে ট্রাক্টরে করে পাচার হয় লুট করা পাথর। প্রশাসনের প্রায় প্রতিদিনের অভিযানের পরও থামছে না এই অবৈধ কর্মকাণ্ড। বরং প্রশাসনের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে পাথরখেকো সিন্ডিকেট।
দিনের আলোতে লুট, রাতে পাচার
সরেজমিনে ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সারপিন টিলার ১০০–১৫০ ফুট উঁচু অংশ কেটে এখন পুকুর আকৃতির বিশাল গর্ত তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে ৫০–৬০ ফুট গভীরতা থেকে শক্তিশালী ‘বোমা’ মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন চলছে। দিনের বেলা পাথর তুলে টিলার আশপাশে স্তূপ করে রাখা হয়। রাত নামলেই ট্রাক্টর ও অন্যান্য যানবাহনে করে এসব পাথর নিয়ে যাওয়া হয় ভোলাগঞ্জ ও পাড়ুয়া এলাকার বিভিন্ন ক্রাসার মেশিনে। সেখানে পাথর ভেঙে বাজারজাত করা হয়।
রাজনৈতিক ছায়া ও প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতা
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই পাথর লুট সিন্ডিকেটে জালিয়ারপাড়, চিকাডহর, ভোলাগঞ্জ ও পাড়ুয়া এলাকার অন্তত অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পদধারী নেতারাও যুক্ত। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় শ্রমিকদের ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে চলছে লুটপাট।
প্রশাসনের অভিযান, ফল শূন্য
সারপিন টিলায় পাথর লুট বন্ধে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রায় প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছে। অভিযানে ‘বোমা’ মেশিন ধ্বংস, পাথর জব্দ এবং শ্রমিকদের আটক করা হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কয়েক দিনের মধ্যেই ধ্বংস করা মেশিন মেরামত করে আবারও নামানো হচ্ছে কাজে। মাঝে মধ্যে ক্রাসার মেশিনে অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও মেশিন ভাঙচুর করা হলেও তা স্থায়ী কোনো প্রভাব ফেলছে না।
গত ১৫ দিনে অন্তত অর্ধশত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তবে অধিকাংশই শ্রমিক হওয়ায় মামলার জাল মূল পরিকল্পনাকারীদের গায়ে লাগছে না।
জেলা প্রশাসকের কঠোর অবস্থানও ব্যর্থ
সাদাপাথর লুটকাণ্ডে সারা দেশে আলোচনার সময়, গত বছরের আগস্টে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেন র্যাবের সাবেক আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। তাঁর কঠোর হস্তক্ষেপে তখন সিলেটের সব কোয়ারিতে পাথর চুরি বন্ধ হয় এবং লুট করা সাদাপাথর উদ্ধার করে প্রতিস্থাপন করা হয়। ওই সময় কিছুদিনের জন্য সারপিন টিলাতেও লুট বন্ধ ছিল।
কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই ফের সক্রিয় হয় লুটেরা চক্র। গত বছরের নভেম্বরের প্রথম দিকে সরেজমিনে টিলা পরিদর্শনে গিয়ে ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন দেখে হতবাক হন জেলা প্রশাসক। তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও বাস্তবে তা টেকেনি।
পুলিশের ভাষ্য
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “সারপিন টিলায় পাথর লুট বন্ধে প্রতিদিনই অভিযান চালানো হচ্ছে। একদিন অভিযান হলে পরদিন আবার লুটেরা ফিরে আসে। এলাকার অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই পাথরের সঙ্গে জড়িত থাকায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও জানান, “পাথর লুটের সঙ্গে জড়িত ৪৭ জন হোতার নামে মামলা করা হয়েছে। তবে তারা এলাকায় না থাকায় গ্রেপ্তারে বেগ পেতে হচ্ছে।”
প্রশাসনের বক্তব্য
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। মেশিন ধ্বংস করা হচ্ছে, জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো—পাথর লুটের পেছনে যাঁরা অর্থ ও প্রভাব জোগাচ্ছেন, তাঁদের ধরতে গেলে নানা চাপের মুখে পড়তে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু শ্রমিক ধরে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে লুট বন্ধ হবে না।”
পরিবেশবিদদের উদ্বেগ
পরিবেশবিদ ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, “সারপিন টিলার মতো প্রাকৃতিক টিলা কেটে এভাবে পাথর উত্তোলন মারাত্মক পরিবেশগত অপরাধ। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে এবং পুরো এলাকার ইকোসিস্টেম ধ্বংসের মুখে পড়ছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই লুট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটতে পারে, যার দায় শুধু লুটেরারা নয়—নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ প্রশাসনকেও নিতে হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ
সারপিন টিলার পাশের এক গ্রামের বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, “আগে টিলাটা ছিল আমাদের এলাকার সৌন্দর্য। এখন দিনের বেলা মেশিনের শব্দে থাকতে পারি না, রাতে ট্রাক্টরের শব্দে ঘুম হারাম। বৃষ্টির সময় মাটি ধসে পড়ার ভয় থাকে সব সময়।”
আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমরা প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকি পাই। লুটেরারা খুব প্রভাবশালী। প্রশাসন আসলে কয়েক দিন শান্ত থাকে, তারপর আবার আগের মতো শুরু হয়।”
পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ সংকট
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে নির্বিচারে টিলা কেটে পাথর উত্তোলন চলতে থাকলে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসবে। ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়বে, আশপাশের বসতি হুমকিতে পড়বে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রশাসনের অভিযান, মামলা ও জরিমানার পরও সারপিন টিলায় পাথর লুট থামছে না। রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের দাপটে সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে—এই লুটপাট কি আদৌ থামানো যাবে, নাকি প্রশাসনের চোখের সামনেই একসময় পুরো টিলাই বিলীন হয়ে যাবে?


