বিশেষ প্রতিবেদক

সমস্যায় জর্জরিত অর্থনীতি নিয়ে দেশের দায়িত্ব নিয়েছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। কিন্তু অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র—ব্যাংক খাত—এখনও অস্থির। বিপুল খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার এবং দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া আর্থিক স্থিতিশীলতা ফেরানো কঠিন হবে।
খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ খাত
বাংলাদেশ ব্যাংক–এর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলো মোট ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা খেলাপি—অর্থাৎ মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং ব্যাংক খাতের গভীর অসুস্থতার প্রতিফলন।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। পরবর্তী ১৫ বছরে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও অপরিকল্পিত ঋণ বিতরণের কারণে তা বহুগুণে বেড়ে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে।
সুশাসনহীনতার মূল্য
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান মনে করেন, ব্যাংক খাতের ক্ষত চিহ্নিত করতে অবিলম্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা উচিত। তাঁর মতে, নামে-বেনামে ঋণ বিতরণ ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের দায়মুক্তি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করেছে। শক্ত হাতে ব্যবস্থাপনা না করলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, ফরাসউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তাঁর ভাষায়, “খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের ক্যান্সারের মতো। এর সমাধান ছাড়া অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে না।” তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়, ছয়টি ব্যাংক মার্জ করা হয় এবং প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। তবু কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক–এর মতে, শুধু সুদহার বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি কমে না; সরবরাহ চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও জরুরি।
হুন্ডি রোধ ও রিজার্ভে স্বস্তি
হুন্ডি কমানোর উদ্যোগের ফলে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা দেশত্যাগের সময় রিজার্ভ ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে তা বেড়ে ২৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণ ও প্রবাসী প্রধান দেশে প্রচারণার মাধ্যমে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলেই রিজার্ভ বেড়েছে। নতুন সরকারের উচিত হবে হুন্ডির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা।
২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থপাচার রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় ও মানিলন্ডারিংবিরোধী কঠোর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য।
নতুন সরকারের করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—
-
স্বাধীন টাস্কফোর্স গঠন করে বড় খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ
-
ঋণ পুনর্গঠন নীতির সংস্কার ও কঠোর নজরদারি
-
মানিলন্ডারিং ও হুন্ডি দমনে জিরো টলারেন্স
-
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
-
রাজস্ব বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত নীতি
সামনে কঠিন পথ
ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ছাড়া সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। নতুন সরকারের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচারের জট খুলতে হবে, অন্যদিকে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ। অন্যথায় ব্যাংক খাতের সংকট দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেই দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।


