
মাওলানা রুমির নিমন্ত্রণে গুরু শামস তাব্রিজি এলেন এক রাতে। খাওয়াদাওয়া শেষে, রুমির কাছে মদের আবদার করে বসলেন গুরু।
রুমি স্তব্ধ! “গুরু, আপনি মদ্যপান করেন?”
তাব্রিজির শান্ত জবাব, “হ্যাঁ।”
শিষ্য ইতস্তত, যেতে চান না মদ আনতে— “মদ আনতে গেলে তো আমার মানসম্মান সব শেষ হয়ে যাবে! সমাজে আমার একটা সম্মান আছে গুরু।”
গুরু পরামর্শ দিলেন— “কোনো সেবককে পাঠাও, নিয়ে আসবে।”
রুমি হতভম্ব— “এ কী করে সম্ভব! ওদের কাছে আপনার-আমার মানমর্যাদা যে ধূলোয় মিশে যাবে!”
“তাইলে তুমি নিজেই যাও”— নাছোড় নির্বিকার শামস তাব্রিজির আদেশ।
০২.
বেরিয়ে পড়লেন ভয়ার্ত, বিব্রত মাওলানা রুমি। লুকিয়েচুরিয়ে হাঁটা ধরলেন মদ্য-পল্লীর দিকে। চারদিকে তাকিয়ে, ঢুকে গেলেন শুঁড়িখানায়। মদ-ভর্তি একটি বোতল কিনে, আলখাল্লার ভিতরে লুকিয়ে, বেরিয়ে এলেন তিনি দ্রুত। জনৈক পরিচিত দেখে ফেললো তাকে, মদ কিনতে।
ছড়িয়ে পড়লো খবর।
তাকে অনুসরণ করতে লাগলো বিরাট জনতার দল, চুপচাপ, অন্ধকারে।
মসজিদের দুয়ারে আসতেই, হাহাকার করে উঠলো অনুসৃত দলের এক রুষ্ট কণ্ঠে, “হায় ইমাম, মদ কিনে আনলেন কোন্ সাহসে আপনি! হায়!”
আলখাল্লার নিচ থেকে, লুকোনো মদের বোতল উদ্ধার করলো ক্ষিপ্ত জনতা। শুরু করলো থুতু নিক্ষেপ, হাত তুললো কেউকেউ, সম্মানিত-পাগড়ি টেনে ফেলে দিলো ধূলোয়।
রুমির মুখে শব্দ নেই, তিনি অপরাধবোধে ও ভয়ে নির্বাক। ক্ষুব্ধ জনতার ক্রোধ বাড়তে থাকলো, মাওলানাকে হ’ত্যার ইচ্ছে পোষণ করলো কেউকেউ।
তখনই মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলেন গুরু শামস তাব্রিজি। ক্ষুব্ধ স্বরে ধিক্কার জানালেন উন্মত্ত জনতাকে— “ধিক্ তোমাদের! ধিক্! তোমরা কোন্ বিবেকে ভেবে নিলে যে, মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির মতো মানুষ মদ্যপান করেন? এ-ই তোমাদের বিবেচনা? খোলো ওই বোতল, ওটায় আছে সিরকা, রান্নার জন্য। খোলো।”
বোতলটি খোলা হলো। ওটা সিরকায় ভর্তি।
রুমি নিজেই অবাক!
মারমুখী জনতা স্তম্ভিত, লজ্জিত, অনুতপ্ত। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিলো তারা।
মসজিদে প্রবেশ করলেন গুরু-শিষ্য।
শামস তাব্রিজি জানালেন শিষ্যকে— “আসার সময় শুঁড়িওয়ালাকে বলে রেখেছিলাম, তুমি এলে সে যেন তোমাকে সিরকা-ভর্তি বোতল দেয়।”
মাওলানা রুমি অভিমান করলেন— “কেন আমার সম্মান নিয়ে এমন ক্রীড়া করলেন আপনি?”
উত্তর দিলেন শামস— “যাতে তুমি এ শিখতে পারো যে: মানুষের দেওয়া সম্মান মূলত একধরণের মোহ। সামান্য একটু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে যারা তোমাকে চরম অপমান করলো, প্রায় মেরেই ফেলেছিলো, তারা তো তোমাকে কখনো সম্মানই করেনি। মানুষের এই সম্মান নিয়েই তুমি গর্ব করতে? মাওলানা, সৃষ্টির কাছ থেকে সম্মান খোঁজা বন্ধ করো; সম্মানপ্রাপ্তির চেষ্টা করো স্রষ্টার কাছ থেকে, অনুগত হও কেবল স্রষ্টার কাছে, যাঁর বিবেচনা মোহের মতো যখনতখন পরিবর্তিত হয় না। মানুষ সম্মান করে নিজ স্বার্থে; সম্মানকে অপমানে পরিবর্তন করতেও দু’বার ভাবে না, তাও নিজ স্বার্থেই।”
ভাষান্তরঃ Salah Uddin Ahmed Jewel
থিমঃ রুমি’জ লিট।


