অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। আর এই রেমিট্যান্সের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তৈরি হওয়া যুদ্ধাবস্থা এখন বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে ফেলেছে বড় অনিশ্চয়তায়।
মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক শ্রমবাজার: কতটা নির্ভরশীল বাংলাদেশ?
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্র বলছে, ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩১ হাজার ১৪৪ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে—
-
৬৭% গেছেন সৌদি আরব
-
দ্বিতীয় স্থানে কাতার
-
চতুর্থ স্থানে কুয়েত
-
ষষ্ঠ স্থানে সংযুক্ত আরব আমিরাত
-
সপ্তম স্থানে জর্দান
অর্থাৎ বাংলাদেশের শ্রমবাজার প্রায় পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর।
যুদ্ধের প্রভাব: প্রবাসীদের আতঙ্ক ও বাস্তব চিত্র
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পাল্টা আক্রমণে উত্তপ্ত পুরো অঞ্চল। প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী এখন অনিশ্চয়তায়।
ইতিমধ্যে
-
আরব আমিরাতে ১ জন
-
বাহরাইনে ১ জন নিহত
-
কুয়েতে ৪ জন
-
বাহরাইনে ৩ জন আহত
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা আংশিক বন্ধ থাকায় গত তিন দিনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৭৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফলে ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না বহু প্রবাসী। কারও ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে।
রেমিট্যান্সে সম্ভাব্য ধাক্কা
২০২৫ সালে দেশে এসেছে ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স—যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয়—এই দুই খাতই বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে—
-
কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে
-
নতুন শ্রমিক পাঠানো কঠিন হবে
-
রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা আসতে পারে
-
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে পড়বে
বিশেষজ্ঞ মত: স্বল্পমেয়াদি বনাম দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন—
“যুদ্ধ যদি দুই সপ্তাহের মধ্যে থেমে যায়, তাহলে বড় প্রভাব পড়বে না। বরং পুনর্গঠনে শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি হলে বড় সংকট তৈরি হবে।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখনো মূলত আনস্কিলড ও সেমি-স্কিলড নির্ভর। ইউরোপ ও জাপান স্কিলড কর্মী চায়। তাই বিকল্প বাজার ধরতে হলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বড় বিনিয়োগ দরকার।
বিকল্প শ্রমবাজার: কতটা সম্ভাবনা?
মালয়েশিয়া
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। তবে ২০২৪ সালের জুনে বাজার আবার বন্ধ হয়েছে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত খরচ ইস্যুতে।
সিঙ্গাপুর
দক্ষ কর্মীর চাহিদা বেশি। অদক্ষ শ্রমিকদের সুযোগ সীমিত।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া
স্কিলড কর্মীভিত্তিক বাজার। ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা বড় বাধা।
ইউরোপ
বিভিন্ন দেশে শ্রমঘাটতি থাকলেও দক্ষতা ও বৈধ প্রক্রিয়া জটিল।
সরকারের প্রস্তুতি
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় হটলাইন ও কল সেন্টার চালু করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন—
“প্রবাসীরা আমাদের টপ প্রায়োরিটি। ভিসা ও টিকিট রিইস্যু সংক্রান্ত সহায়তায় সরকার উদ্যোগ নেবে।”
দূতাবাসগুলো নিরাপদ স্থানে অবস্থানের নির্দেশনা দিয়েছে।
সামনে কী?
সম্ভাব্য চিত্র:
-
যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদি হলে ক্ষতি সীমিত
-
দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় অর্থনৈতিক চাপ
-
রেমিট্যান্স কমলে গ্রামীণ অর্থনীতি সংকটে পড়তে পারে
-
শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ এখন সময়ের দাবি
উপসংহার
বাংলাদেশের শ্রমবাজার এককেন্দ্রিক হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতিকে টেকসই রাখতে এখনই প্রয়োজন—
-
দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন
-
নতুন শ্রমবাজারে কূটনৈতিক উদ্যোগ
-
প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা
যুদ্ধ কতদিন চলবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কাঠামোগত পরিবর্তন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য।


