শাহ্ মোঃআক্তার আলম আল্-মাইজভান্ডারি

মানব দেহের নিয়ামত ও সাত লতিফার আলম আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, আবার ভেতরে রেখেছেন সাতটি নূরানী দরজা। এগুলোকে বলা হয় লতিফা। প্রতিটি লতিফা একটি আলম বা আধ্যাত্মিক জগতের দরজা।
বন্ধ থাকলে: বান্দা জাহান্নামের সাত দরজার সাথে যুক্ত হয়।
খোলা থাকলে: সাত আলমের সিঁড়ি বেয়ে বান্দা আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে যায়।
১. কল্ব লতিফা – হযরত আদম (আঃ)।
অবস্থান: বাম স্তনের দুই আঙুল নিচে।
আলম: আলমে মালাকুত।
নবী: আদম আঃ, দাউদ আঃ।
ব্যাখ্যা: মালাকুত হলো ফেরেশতাদের জিকিরের জগত। আদম আঃ-কে আল্লাহ এই আলমের রহস্য শিখিয়েছিলেন। দাউদ আঃ-এর কণ্ঠে জিকিরের নূর মালাকুতের প্রভাব। কল্ব লতিফা এই আলমের দরজা। কল্ব খোলা হলে অন্তরে “আল্লাহ, আল্লাহ” ধ্বনি নিজে নিজে চলতে থাকে।
২. রূহ লতিফা – হযরত ইব্রাহিম (আঃ), নূহ (আঃ)।
অবস্থান: ডান স্তনের দুই আঙুল নিচে।
আলম: আলমে জাবারুত।
ব্যাখ্যা: জাবারুত হলো আল্লাহর কুদরতের জগৎ। এখানে ইলাহী হুকুম কার্যকর হয়। নূহ আঃ-এর সবর ও দাওয়াত, ইব্রাহিম আঃ-এর আগুনে না পোড়া—এসব জাবারুতের রহস্য। রূহ লতিফা খোলা হলে বান্দা আল্লাহর কুদরতের সাথে সম্পর্কিত হয়।
৩. সির লতিফা – হযরত মূসা (আঃ), খিজির (আঃ)।
অবস্থান: বাম স্তনের দুই আঙুল উপরে।
আলম: আলমে আনকাবুল এলাম।
ব্যাখ্যা: এই আলমে আর্জি পেশ হয়। যখন নবী-ওলি, আওলাদুল্লাহ দোয়া করেন—এই আলমেই তাদের আবেদন পৌঁছে। মূসা আঃ আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলেছিলেন (কালিমুল্লাহ), খিজির আঃ গোপন রহস্য শিক্ষা দিয়েছিলেন। সাধকের সির খুললে তার দোয়া ও আর্জি সরাসরি আল্লাহর দরবারে পৌঁছে।
৪. খফি লতিফা – হযরত ঈসা (আঃ)।
অবস্থান: ডান স্তনের দুই আঙুল উপরে।
আলম: আলমে লাহুত।
ব্যাখ্যা: লাহুত হলো সৃষ্টির রহস্যের জগত। আল্লাহর “কুন ফাইয়াকুন” এখানে প্রতিফলিত হয়। ঈসা আঃ এখান থেকে রহস্য দেখে মুজিযা ঘটাতেন—মৃতকে জীবিত করতেন, অন্ধকে চোখ দিতেন। সাধকের খফি খুললে গায়েবী রহস্য তার সামনে উন্মোচিত হয়।
৫. আখফা লতিফা – হযরত মুহাম্মদ ﷺ।
অবস্থান: বুকের দুই হাড়ের মাঝখানে।
আলম: আলমে হাহুত।
ব্যাখ্যা: হাহুত হলো জান্নাতুল মাওয়া ও জান্নাতুল ফেরদাউসের নূরানী জগত। রাসূল ﷺ-এর নূর এখানে সর্বোচ্চ প্রভাবশালী। আখফা লতিফা খুললে বান্দা রাসূল ﷺ-এর রহমতের সাগরে ভেসে যায়, জান্নাতুল ফেরদাউস তার কাছে উন্মুক্ত হয়।
৬. আন্না লতিফা – আল্লাহর দিদারী মোকাম।
অবস্থান: কপালে।
আলম: আরশে আজীম (ওহাদানিয়াত, আহাদানিয়াত)।
ব্যাখ্যা: এখানে আহমদ (রাসূল ﷺ-এর নূর), আহাদ (আল্লাহর সত্তা), আরশে আল্লাহর কুরসি—সব মাখলুক ও খালিকের সীমান্ত মিলিত। এটাকে বলা হয় ওহাদানিয়াত ও আহাদানিয়াত। আন্না খুললে বান্দা দুনিয়ার সব পর্দা পেরিয়ে আল্লাহর দিদার লাভ করে।
৭. নফস বা আমিত্ত্বের ৪টি পর্যায় :
1. নফস-এ আম্মারা/সবসময় নিজেকে আদেশ করতে থাকে/কুকুরের ন্যায় দেখতে। (সূরা ইউসুফ-12:53)।
2. নফস-এ লাওয়ামা/ অনুতপ্তকারী নফস/ ঘোড়া/ ষাঁড়ের ন্যায় দেখতে।(সূরা কিয়ামা-75:2)।
3. নফস-এ মুলহিমা/নিজেকে অনুপ্রাণিত করে/ ছাগলের মতো দেখতে।(সূরা শামস-91:7-9)।
4. নফস-এ মুত’মাইন্নাহ/ প্রশান্ত চিত্ত/ মানুষের মতো দেখতে/ঠিক আপনার মতো। (সূরা ফযর- 89:27)।
শুধুমাত্র দীদারে ইলাহীর পরে, একজন ইনসান মানুষ হতে পারে এবং তার নফস হয় মুত’মাইন্নাহ।
ক্বলব বা আধ্যাত্মিক হৃদয় অনুযায়ী আমাদের নফসের পরিবর্তন হয়।
ক্বলবের পর্যায়সমূহ:
1. ক্বলব-এ সুনেবর/ অচেতন ক্বলব।
2. ক্বালবে সালিম/সুরক্ষিত ক্বলব/সুরা আশ-শুআরা 26:88।
2. ক্বলবে মুনিব/ নির্দেশিত ক্বলব/ সূরা ক্বাফ-50:33।
3. ক্বলবে শহীদ/ সুরা ক্বাফ 50:37।
অবস্থান: মনের গভীরে।
ব্যাখ্যা: নফস যদি অপবিত্র থাকে তবে বান্দা জাহান্নামের পথে চলে যায়। যদি নফস মুতমাইন্না হয়ে যায় তবে গায়েবের রহস্য উন্মোচিত হয়। কুরআন: হে প্রশান্ত নফস! তুমি তোমার রবের দিকে ফিরে এসো, সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক অবস্থায়।” (সূরা ফজর: ২৭-২৮)।
সুফি সাধকদের বয়ান :
খাজা হুজুর রহ. “কল্ব হলো আল্লাহর আয়না। যখন কল্ব জাগ্রত হয় তখন মালাকুতের দরজা খুলে যায়।”
গাউসুল আজম রহ.“নফসকে দমন না করলে কোনো লতিফা জীবিত হয় না।”
গহর শাহী রহ.: “সাত লতিফা যদি জীবিত হয় তবে বান্দা সাত আলমে ভ্রমণ করে রবের দিদার লাভ করে।”
প্রতিটি লতিফা = এক একটি আলমের দরজা।
প্রতিটি আলম = একেক নবীর ফয়েজ।
সবগুলো খোলা থাকলে = আল্লাহর দিদার।
মানবদেহে সাতটি লতিফা আছে, আর প্রত্যেক লতিফা একটি করে আলমের দরজা।
কল্ব → আলমে মালাকুত।
রূহ → আলমে জাবারুত।
সির → আলমে আনকাবুত।
খফি → আলমে লাহুত।
আখফা → আলমে হাহুত।
আন্না → আরশে আজীম (আহাদানিয়াত আল্লাহ দিদারি মোকাম)।
নফস → নিজের মন।
কিন্তু এই দরজাগুলো নিজের ইচ্ছেয় খোলে না।
মুর্শিদ ছাড়া সাধক অন্ধকারে থেকে যায়, নফসের খেয়ালে বিভ্রান্ত হয়, আলমগুলোর সফর অসম্ভব হয়।
মুর্শিদের তাওয়াজ্জুহ ও বারকতের মাধ্যমেই লতিফাগুলোতে নূর জ্বলে উঠে এবং একে একে সাত আলম অতিক্রম করে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছানো যায়।
শাহ্ মোঃআক্তার আলম আল্-মাইজভান্ডারি
খলিফা
দরবারে গাউছুল আজম।


