
১৮২৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ মে মাওলানা শাহ আব্দুল আজিজের ওফাতের পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন তাঁর পুত্র শাহ মুহম্মদ ইসহাক। ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে শাহ ইসহাক হিজরত করেন। হিজরতকালে মক্কা শরীফে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (র) এর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। মক্কায় অবস্থানকালে শাহ ইসহাক হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কীকে দিল্লীতে তাঁর স্থালাভিষিক্ত করেন। এ সময় মাওলানা কাসেম নানুতবী, মাওলানা রশিদ আহমদ গাংগুহি, মাওলানা ফয়জুল হাসান সাহারানপুরী, মাওলানা রহমতুল্লাহ কীরানুবী, মাওলানা মাজহার, মাওলানা মুহম্মদ মুনীর এবং মাওলানা মুহম্মদ ইয়াকুব নানুতবী প্রমূখ উলামায়ে কিরাম হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (র) এর বায়াত গ্রহণ করেন।
এ সময় হাজী ইমদাদুল্লাহর নেতৃত্বে সংস্কার ও যিহাদি চেতনা সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি দুটি উপায়ে আন্দোলনের অগ্রগতি প্রদান করেন। এক. পীর-মুরিদী তথা তাসাউফের শিক্ষা-দীক্ষা, দুই. স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য যিহাদে অবতীর্ণ হওয়া। তাঁর দল শামেলীতে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। যুদ্ধের প্রস্তুতির পূর্বে সাহারানপুর থেকে ইংরেজদের একটি সশস্ত্র বাহিনী কামানসহ শামেলীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। মুজাহিদদের একটি ক্ষুদ্র দল হযরত গাংগুহির নেতৃত্বে পথিমধ্যে ওই বাহিনীর উপর গেরিলা আক্রমন চালায়। এই আক্রমনে ইংরেজ বাহিনী হতভম্ব হয়ে পড়ে। তারা অস্ত্রশস্ত্র ত্যাগ করে পলায়ন করেছিল।
হযরত গাংগুহি ইংরেজদের ফেলে যাওয়া তোপ-কামান ও অস্ত্রশস্ত্র তুলে এনে হাজী ইমদাদুল্লাহ হুজুরের মসজিদে জড়ো করেন। এরপর মুজাহিদরা হযরত কাসেম নানুতবীর নেতৃত্বে ইংরেজদের শামেলীর ঘাঁটিতে আক্রমন করেন। এই যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনী চরমভাবে পরাজিত হয়। অত:পর ইংরেজরা বিপুল শক্তি নিয়ে থানাবনে গঠিত মুজাহিদদের অস্থায়ী সরকারের উপর আক্রমন করে। এই আক্রমনে মুজাহিদরা পরাজিত হন। এরপর মুজাহিদদের উপর শুরু হয় নির্যাতন ও দলনযজ্ঞ। নির্বিচারে গণহত্যা চালানো হয়। দায়ের করা হয় অসংখ্য রাজনৈতিক মামলা। এসব মামলার বিচারে অনেককে ফাঁসি এবং অনেককে আন্দামান দীপে নির্বাসন দেওয়া হয়। হযরত গাংগুহিকে কারারুদ্ধ করা হয়।
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মুজাহিদদের স্বাধীনতা যুদ্ধ উপ-মহাদেশের ইতিহাসে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই যুদ্ধের মাধ্যমে সৈয়দ আহমদ বেরলভীর বাহিনী ভারত সাম্রাজ্যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জে অবতীর্ণ হয়েছিল। গণবিপ্লব যদিও সফল হয়নি। কিন্তু এর ফলাফল ছিল সুদূর প্রসারী। এই বিপ্লবের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজত্বের অবসান ঘটে। ভারত উপ-মহাদেশের কর্তৃত্ব ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তথা মহারাণী ভিক্টোরিয়ার অধীনে ন্যাস্ত হয়।
ফকির মজনু শাহ, তিতুমির, টিপু সুলতান, সৈয়দ আহমদ বেরলভী, হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী, ফজলে হক খয়রাবাদীসহ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতাদের নেতৃত্বে মুসলমানদের উপর্যপুরি আক্রমনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা ভেবে পাচ্ছিল না যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ভারতে মুসলমানরা কিভাবে এত শক্তিশালী আক্রমন করে। তারা যত মরছে ততই যেন বেড়ে চলেছে। এ ধরনের অদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা মুসলমানদের শক্তির উৎস অনুসন্ধান শুরু করে। এই অনুসন্ধানে তারা জানতে পারে যে, পবিত্র কুরআন মজিদই হলো, মুসলমানদের আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস। এই অনুসন্ধান রিপোর্ট নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রী ব্রিটেনের পার্লামেন্টে পবিত্র কুরআন মজিদ প্রদর্শন করে বলেছিল, ‘এই কুরআন গ্রন্থের কার্যকারিতা যতদিন অব্যাহত থাকবে, ততদিন ভারতবর্ষে আমাদের শাসনতন্ত্র নিরাপদ নয়। যেভাবেই হোক এই গ্রন্থের কার্যকারিতা তথা মুসলমানদের আধ্যাত্মিক শক্তিলাভের মাধ্যমকে ধ্বংস করতে হবে’।
এই প্রেক্ষাপটে তারা প্রথমে ভারতবর্ষের সকল কুরআন মজিদ সংগ্রহ করে গুদামজাত করেছিল। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। অসংখ্য হাফেজ ও আউলিয়াদের অন—রে কুরআন মজিদ রক্ষিত ছিল। এরপর তারা তাদের খ্রিষ্টান মিশনারীর মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মান—রিত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হয়নি। কিছু ধোপা, নাপিত, মুচি ও ডোম ছাড়া উলেখযোগ্য কোনো মুসলমান খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়নি। তখন তারা হতাশ হয়ে অতি নৃশংস পন্থা অবলম্বন করেছিল। তারা সমাজের ক্ষমতাশালী সচেতন শিক্ষিত মুসলমান, আধ্যাািত্মক শক্তির অধিকারী আউলিয়া ও বিশিষ্ট আলেম-উলামাদেরকে গুপ্তভাবে হত্যা করার কর্মসূচি গ্রহণ করে। গুপ্তঘাতক দ্বারা তারা অসংখ্য আলেম-উলামা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যা করেছিল।
এ সময় উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা হযরত ফজলে হক খয়রাবাদী (র) এর দরবারে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে। ঘাতক দল যখন হযরত খয়রাবাদী হুজুরকে হত্যা করতে তাঁর খানকায় উপস্থিত হয় তখন খয়রাবাদী পীর সাহেব হুজুর তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, কীভাবে তাঁকে হত্যা করা হবে? তখন এক ঘাতক তার হাতে থাকা বন্দুক দিয়ে উড়ন্ত একটি পাখী গুলি করে মেরে দেখায়। ঘাতকদের এই বিমূর্ত উত্তরের জবাবে হযরত খয়রাবাদী হুজুর বলেন, ‘তুমহারা হাতিয়ারকা কাম হ্যায় জিন্দাকো মুরদা বানানা, আউর তুমলোক দেখ, মেরা আল্লাহকা হাতিয়ারকা কাম কেয়া হ্যা, মেরা আল্লাহকা হাতিয়ারকা কাম হ্যায় মুরদাকো জিন্দা বানানা’। এই বলে তিনি তাঁর হাতে থাকা তাসবিহ দ্বারা মৃত পাখীটির শরীরে ছোঁয়া দিলে পাখীটি জীবন্ত হয়ে উড়ে যায়। এই অলৌকিক ঘটনায় ঘাতক দল হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। তারা খয়রাবাদী হুজুরের কাছে ক্ষমা-ভিক্ষা করে কালিমা পড়ে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হয়।
এই অলৌকিক ঘটনা ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কুচক্রী মহলে ভিষণভাবে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। তারা এই সংবাদ ব্রিটিশ কেন্দ্রীয় সরকারকে অবহিত করে। কেন্দ্রীয় সরকার ওই ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েচিল। কেন্দ্রীয় সরকার মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের যিহাদি শিক্ষা ও ইলমে তাসাউফের আমল-আকিদাকেই আধ্যাত্মিক শক্তিলাভের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে। অত:পর শুরু করে মুসলিম নিধন ও মুসলমানদের ঈমান, আমল ও আকিদা ধ্বংস করার সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র।
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের ষড়যন্ত্রের ফসল হিসেবে সৃষ্টি হয় জামায়াতে ইসলামী, তাবলীগ জামায়াত এবং দেওবন্দ দারুল উলুম মাদ্রাসা। ব্রিটিশ শাসকদের পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এই তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠালাভ করে। এই তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যিহাদ নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। ফলে আজাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব মুসলমানদের হাত থেকে হিন্দুদের হাতে চলে যায়। এ কারণে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় মুসলমানরা তাদের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়। ভারত-পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির মধ্য দিয়ে একটি ভূখন্ডগত ভারসাম্যহীন বিভক্তির যাতনা ভারতবর্ষের মানুষ বর্তমানেও ভোগ করে চলেছে।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


