অনলাইন প্রতিবেদক

বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে পানি ব্যবস্থাপনা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সময়েই সরকারগুলো পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান খাল খনন প্রকল্প পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই প্রতিবেদনে তার বক্তব্যের সারাংশ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সম্ভাব্য সুফল ও বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হলো।
১. তারেক রহমানের বক্তব্যের সারাংশ
বিএনপির ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন—
-
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছিলেন।
-
এই উদ্যোগের ফলে একফসলি জমি দুই ফসলি এবং দুই ফসলি জমি তিন ফসলিতে রূপ নেয়।
-
সেচ সুবিধা বৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদন বেড়ে খাদ্য সংকট কাটিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হয়।
-
বিএনপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দেন।
২. ঐতিহাসিক পটভূমি: জিয়াউর রহমানের সময়কার খাল খনন প্রকল্প
১৯৭০–৮০ এর দশকে পানি ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে সরকার কয়েকটি বড় উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
ক. “খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি”
-
১৯৭৭–১৯৮০ সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিভিন্ন অঞ্চলে খাল পুনঃখনন ও ছোট জলাধার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
-
এর উদ্দেশ্য ছিল—বর্ষার পানি সংরক্ষণ, বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশন, এবং শুকনা মৌসুমে সেচের জন্য পানি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
খ. এই উদ্যোগের সম্ভাব্য প্রভাব (ঐতিহাসিক গবেষণা অনুযায়ী)
-
স্থানীয় সেচ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান চাষের সুযোগ তৈরি হয়।
-
কিছু অঞ্চলে ফসলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
-
পানি জমে থাকা নিম্নাঞ্চলে বন্যা-পরবর্তী কৃষিকাজ সহজ হয়েছিল।
অনেক গবেষক খাল খনন উদ্যোগকে বিকেন্দ্রীকৃত পানি ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর স্থানীয় উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
৩. খাল খনন: সম্ভাব্য সুফল
বিশেষজ্ঞদের মতে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্নলিখিত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে:
১. বন্যা নিয়ন্ত্রণ
-
প্রাকৃতিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতা বাড়ে
-
আকস্মিক প্লাবনের ক্ষতি কমে
২. সেচব্যবস্থা উন্নয়ন
-
শুষ্ক মৌসুমে জমিতে পানি সরবরাহের সুযোগ বৃদ্ধি
-
সেচ খরচ কমানো ও উৎপাদন বাড়ানো
৩. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি
-
একফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করা সম্ভব
-
মোট ফসলি এলাকা বৃদ্ধি
৪. পানি সংরক্ষণ
-
বর্ষার অতিরিক্ত পানি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা যায়
-
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে
৫. পরিবেশগত সুবিধা
-
জলাশয় বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় প্রতিবেশের ভারসাম্য বৃদ্ধি পায়
-
মাছের প্রাকৃতিক বিস্তার বাড়ে
৪. বর্তমান প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ
বর্তমান সময়ে খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েকটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
১. দখল ও ভরাটের সমস্যা
বাংলাদেশে অনেক খাল দীর্ঘদিন ধরে দখল বা ভরাট অবস্থায় রয়েছে। পুনঃখনন করতে গেলে ব্যাপক উচ্ছেদ ও পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন।
২. প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি ঝুঁকি
পূর্বে খাল খনন প্রকল্পে যন্ত্রপাতির ব্যবহার, মাটি পরিবহন ও খরচ অনিয়মিত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল।
৩. দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের অভাব
খনন শেষ হলেও নিয়মিত ড্রেজিং ও রক্ষণাবেক্ষণ না থাকলে খাল আবার অকার্যকর হয়ে যায়।
৪. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
অনিয়মিত বর্ষণ, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া—এসব বিষয় খাল খনন পরিকল্পনা নতুনভাবে বিবেচনা করতে বাধ্য করে।
খাল খনন প্রকল্প বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারেক রহমানের বক্তব্যে উল্লেখিত বিষয়গুলো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হলেও, খাল খনন—পরিকল্পিত, বৈজ্ঞানিক ও দুর্নীতিমুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে—আজও দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ হতে পারে।
তবে আধুনিক প্রযুক্তি, জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং স্থানীয় পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা বিবেচনা করে নতুন প্রজন্মের পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।


