আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২৫ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং বিগত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম-খুন আর নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের
অভিযোগে বিচার চলছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন এখনো চাকরিরত আছেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত ৯ জন কর্মকর্তার মধ্যে পাঁচজন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি)। সেনাবাহিনী এবং জাতির জন্য এই ঘটনা অত্যন্ত লজ্জা ও কলঙ্কজনক। কিন্তু এই কলঙ্কময় ঘটনার জন্য জনগণ কিংবা আদালত কাকে দায়ি করবে? যারা হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তাদের, নাকি যার নির্দেশে হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে তাকে?
অদ্য ১৭ অক্টোবর ২০২৫ শুক্রবার সকালে বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপির নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার একটি প্রতিনিধি দল রাজধানীর পুরানা পল্টনে বিএইচপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যন সুফি সাগর সামস্ এর সঙ্গে সাক্ষাৎ কালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সেনা কর্মকর্তাদের বিচার সম্পর্কিত মতবিনিময়কালে সুফি সামস্ উপরোক্ত কথাগুলো বলেন।
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এই নির্দেশ কার্যকর করতে ব্যবহৃত হয়েছে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), যা সাংবিধানিক কাঠামোয় প্রধানমন্ত্রীর অধীনস্থ একটি দপ্তর হিসেবে পরিচালিত। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় একটি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা কতটা নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে?
বিএইচপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরও বলেন, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (Directorate General of Forces Intelligence – DGFI) বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, যার মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এবং অভ্যন্তরীণ হুমকি নিরূপণ করা। কিন্তু রাজনৈতিক সরকারগুলো এই সংস্থাটিকে বিরোধী রাজনৈতিক দল বা ন্যায্য দাবির লক্ষ্যে সংগঠিত জনগোষ্ঠীকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিশেষত পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ডিজিএফআই এর কার্যক্রমকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। যেমন, সাংবাদিক নজরদারি, বিরোধীদলীয় নেতাদের ওপর চাপ প্রয়োগ, বিরোধী দলের আন্দোলন দমন, বিশেষভাবে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার ইত্যাদি।
সুফি সামস্ বলেন, ট্রাইব্যুনালের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, জুলাই অভ্যুত্থানকালে সেনা সদস্যদের ওপর হত্যার নির্দেশ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আসে, যা ডিজিএফআই এর শৃঙ্খলা শৃঙ্খল (chain of command) ব্যবহার করে বাস্তবায়িত হয়। ডিজিএফআই প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকায়, এটি কার্যত রাজনৈতিক প্রশাসনের অংশে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সংস্থার নীতি ও কার্যক্রমে সামরিক পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যদি রাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গোয়েন্দা দপ্তর ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করেন, তবে গণমানুষের অধিকার খর্ব, গোয়েন্দা তথ্য বিকৃতি, সীমাহীন ক্ষমতার অপব্যবহার এবং চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়।
বিএইচপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দাবি জানিয়ে বলেন, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরকে (ডিজিএফআই) প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পৃথক করে সেনাপ্রধানের অধীনে ন্যাস্ত করতে হবে। গোয়েন্দা কার্যক্রমে রাজনৈতিক নির্দেশ নিষিদ্ধ করার জন্য স্পষ্ট নীতিমালা (Operational Neutrality Charter) প্রণয়ন করতে হবে। সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে ডিজিএফআই এর ভূমিকা ও দায়বদ্ধতার কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। স্বাধীন সংসদীয় তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে, যাতে গোয়েন্দা সংস্থার বাজেট, নিয়োগ ও কার্যক্রম স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ডিজিএফআই একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে এ সংস্থা পরিচালিত হলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়ে। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস একান্তভাবে আবশ্যক। ডিজিএফআই-কে সেনাপ্রধানের অধীনে আনলে কেবল রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধই নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও জবাবদিহিমূলক হবে বলে মন্তব্য করেন বিএইচপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপির প্রেসিডিয়াম সদস্য, মোঃ ফজলুল বারী, ভাইস চেয়ারম্যন, খন্দকার নাজমুল হক অপু, মুজিবুর রহমান চিশতী, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ ইব্রাহিম খলিল বাদল, মোঃ আইয়ুব আলী, মোঃ রেজাউল করিম, অর্থ বিষয়ক সম্পাদক ফরিদ আহমেদ, দফতর সম্পাদক মোঃ খুরশীদ আলম সরকার, কেরাণীগঞ্জ থানার সভাপতি, মোঃ এমরান খান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য রাখেন।