সুফি সাগর সামস্

ফকির সন্নাসি বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে শেরপুর অঞ্চলে ১৮শ শতকে পাগলাপন্থী আন্দোলন লক্ষ্যণীয় প্রভাব ফেলেছিল। এই আন্দোলনের প্রবর্তক করিম শাহ ছিলেন মজনু শাহের অনুসারী, যিনি মৃত্যুর পর শেরপুরে নিজস্ব খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজেকে মাস্তান বা পাগলা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন এবং প্রচলিত ধর্মীয় রীতি-নীতির প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন না।
সমাজ ও অনুসারী
করিম শাহের শিষ্যবৃন্দ বহুসাংস্কৃতিক ও বহুধর্মীয় ছিল। হিন্দু, মুসলমান, গারো এবং হাজৎ সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে তিনি অনুসারী তৈরি করেছিলেন। এজন্য করিম শাহের শিষ্যদের পাগলাপন্থী নামে খ্যাতি লাভ হয়।
নেতৃত্বের পরিণতি
করিম শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র টিপু শাহ পাগলাপন্থী দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। করিম শাহের আহ্বানে কৃষক সম্প্রদায় ও হিন্দু-মুসলিম উপজাতি রায়তরা শেরপুরের পাগলদের অস্তানায় আশ্রয় নেন।
সশস্ত্র বিদ্রোহ (১৮২৫–১৮৩৩)
টিপু শাহের নেতৃত্বে পাগলাপন্থীরা ১৮২৫ থেকে ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অত্যাচারী জমিদার এবং ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। বিদ্রোহের শেষ পর্যায়ে (১৮৩৩) তারা শেরপুরের জমিদার বাড়ি এবং কাচারি লুট করে সরকারী ভবন ও পুলিশ স্টেশন জ্বালিয়ে দেয়।
বিদ্রোহ দমন ও শাস্তি
কোম্পানী সরকারের পক্ষ থেকে সৈন্যবাহিনী বাড়ানো হয় এবং ঘরে ঘরে তল্লাশী চালিয়ে বিদ্রোহীদের আটক করা হয়। বিদ্রোহ দমন কার্যক্রমে:
-
১৫ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়
-
১৫০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়
-
২৫ জনকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসন দেওয়া হয়
এই কঠোর দমন অভিযান শেষে পাগলাপন্থী আন্দোলন সমাপ্ত হয়।
শেরপুরের পাগলাপন্থী আন্দোলন ব্রিটিশ শাসন ও জমিদার শোষণের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ কৃষক ও সামন্তবিরোধী বিদ্রোহ ছিল। করিম শাহ এবং টিপু শাহের নেতৃত্বে সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা পেরিয়ে বহু সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করেছিল।


