মোঃ খুরশীদ আলম সরকার

আর্থিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের নবম পে-স্কেল ঘোষণা থেকে কার্যত সরে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশনের কার্যক্রম থেমে নেই। বরং কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সরকারের কাছে জমা দিতে—যা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়বে নির্বাচিত নতুন সরকারের ওপর।
সরকারি সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে পে-স্কেল ঘোষণা করা সম্ভব না হলেও একটি সুস্পষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক রেখে যাওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। এতে করে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বিলম্ব ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
নির্বাচন বনাম অর্থনীতি: সিদ্ধান্তহীনতার মূল কারণ
পে-কমিশনের একাধিক সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনই এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। নির্বাচনী প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যয়ের চাপের মধ্যে নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। উপরন্তু, দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বিবেচনায় রেখে বড় ধরনের ব্যয় সিদ্ধান্ত এড়াতে চায় সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্পষ্ট করে বলেছেন, নির্বাচনের আগে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার কোনো সম্ভাবনা নেই, এবং অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত।
পে-কমিশনের অগ্রগতি: শেষ পর্যায়ে সুপারিশ
২৩ সদস্যের ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠিত হয় গত ২৭ জুলাই। কমিশনের সভাপতি সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পুনর্গঠনই কমিশনের মূল দায়িত্ব।
কমিশন সূত্র জানায়, ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত সভা হওয়ার কথা রয়েছে। এ সভায় নবম পে-স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত করে প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হবে। কমিশনের মেয়াদ ছয় মাস—ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তা শেষ হওয়ার কথা। নির্বাচনের তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি হওয়ায় সময়সূচি অত্যন্ত টাইট।
বেতনের অনুপাত ও সর্বনিম্ন বেতন: কোন পথে যাচ্ছে কমিশন
কমিশনে বেতনের অনুপাত নিয়ে তিনটি বিকল্প আলোচনা হয়েছে—১:৮, ১:১০ ও ১:১২। এর মধ্যে ১:৮ অনুপাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন (২০তম গ্রেড) ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনের ব্যবধান হবে আট গুণ।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০তম গ্রেডের বেতন যদি ১০০ টাকা ধরা হয়, তাহলে সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন হবে ৮০০ টাকা। এই অনুপাত তুলনামূলকভাবে সংযত—একদিকে প্রশাসনিক ভারসাম্য, অন্যদিকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।
সর্বনিম্ন বেতন নিয়েও তিনটি প্রস্তাব রয়েছে:
-
২১ হাজার টাকা
-
১৭ হাজার টাকা
-
১৬ হাজার টাকা
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় প্রথম প্রস্তাবটি বেশি গ্রহণযোগ্য হলেও রাজস্ব সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। কমিশনের পরবর্তী সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
মহার্ঘ ভাতা: অন্তর্বর্তী স্বস্তি
নতুন পে-স্কেল ঘোষণা ও বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী মহার্ঘ ভাতা পাচ্ছেন। তবে কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবি—এ ভাতা মূল্যস্ফীতির তুলনায় অপর্যাপ্ত এবং স্থায়ী সমাধান নয়।
কমিশনের নির্দেশনায় একজন কর্মচারীর পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয়জন ধরে ব্যয় হিসাব করা হয়েছে—যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের অবস্থান: সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের কাঁধে
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, কমিশনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে এবং দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের পরিকল্পনা সময়োপযোগী একটি বেতন কাঠামো ঘোষণা করা। সময় পেলে ঘোষণা করব, বাস্তবায়ন করবে নতুন সরকার।”
এই বক্তব্যেই স্পষ্ট—বর্তমান সরকার দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে নীতিগত কাঠামো প্রস্তুত করে যেতে চায়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
নবম পে-স্কেল এখন আর শুধু বেতন কাঠামোর প্রশ্ন নয়—এটি হয়ে উঠেছে নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের একটি টেস্ট কেস। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি ও প্রশাসনিক ভারসাম্যের মধ্যে কোন পথ বেছে নেয়—সেদিকেই তাকিয়ে আছে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী।
একদিকে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন হিসাব—নবম পে-স্কেল তাই আপাতত প্রতিশ্রুতির খাতায় বন্দী, বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।


