
আরপিও: আইন নাকি কৌশলগত অস্ত্র?
সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, জোটভুক্ত হলেও নিবন্ধিত দলের প্রার্থীদের নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন বাধ্যতামূলক। নির্বাচন কমিশনের এই বিধান কার্যত বড় দলগুলোর জন্য একটি কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, একাধিক ছোট দলের নেতাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—ধানের শীষ প্রতীক চাইলে দল ছাড়তে হবে, নচেৎ আসন থাকলেও প্রতীকের কারণে মাঠে টিকে থাকা কঠিন হবে।
এই বাস্তবতায় কেউ দল বিলুপ্ত করেছেন, কেউ বহিষ্কারের নাটক সাজিয়ে নিজেকে ‘স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তের’ মাধ্যমে বিএনপিতে যুক্ত করেছেন। দলীয় আদর্শ নয়, বরং নির্বাচনী প্রতীক হয়ে উঠেছে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু।
গণঅধিকার পরিষদ: বহিষ্কার না প্রস্থান?
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খানের বিএনপিতে যোগদান নিয়ে দলটি বহিষ্কারের ব্যাখ্যা দিলেও সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রাশেদ খান অনেক আগেই ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীক পাওয়ার বিষয়ে আশ্বাস পেয়েছিলেন। বহিষ্কারের ঘোষণা এসেছে বিএনপিতে যোগদানের পরপরই—যা ঘটনাটিকে ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’ নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রস্থান বলেই ইঙ্গিত দেয়।
একই সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে বিএনপি একটি আসন ছাড়লেও তাকে ধানের শীষ দেওয়া হয়নি। ফলে দলটির ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে—একজন নেতা বিএনপিতে বিলীন, আরেকজন জোটে থেকেও প্রতীকের বাইরে কেন?
এনসিপি ও জামায়াত: ঐক্যের আড়ালে দ্বন্দ্ব
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতের সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা চললেও ভেতরে রয়েছে গভীর বিভক্তি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় গেলে এনসিপির ‘সংস্কারপন্থি’ ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এ আশঙ্কায় একটি শক্তিশালী অংশ বিরোধিতা করছে। এই দ্বন্দ্বেরই প্রকাশ ঘটেছে ঢাকা-৯ আসনে ডা. তাসনিম জারার স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণায়।
এই সিদ্ধান্ত শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং এনসিপির ভেতরের আস্থার সংকটকেও প্রকাশ করে।
অলি আহমদ ও এলডিপি: দরকষাকষির ব্যর্থ সমীকরণ
২০ বছরের রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এলডিপির বিএনপি ছাড়ার পেছনে আদর্শিক মতপার্থক্যের চেয়ে আসনসংখ্যাই প্রধান কারণ—এমনটাই বলছেন উভয় পক্ষের ঘনিষ্ঠ সূত্র। অলি আহমদের নিজের জন্য এবং ছেলের জন্য দুটি আসনের দাবি বিএনপি পূরণ না করায় সমঝোতা ভেঙে যায়। পরে জামায়াতের সঙ্গে তিনটি আসনের সম্ভাব্য সমঝোতার খবর এলেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
অন্যদিকে, এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদের বিএনপিতে যোগদান প্রমাণ করে—দল ভাঙলেও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আলাদা পথে এগোচ্ছে।
পুরোনো মিত্রদের বিচ্ছেদ: আস্থার সংকট
বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও জেএসডির মতো দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব কেবল আসনসংখ্যার দ্বন্দ্ব নয়; বরং ‘সমঝোতার রাজনীতিতে’ আস্থার অভাবের প্রতিফলন। জেএসডি নেতারা মনে করছেন, যুগপৎ আন্দোলনের সময় দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন নির্বাচনী সমঝোতায় নেই।
ছোট দল, বড় লাভ?
বিএনপি একদিকে পুরোনো মিত্র হারালেও অন্যদিকে নতুন মুখ ও ছোট দলকে জায়গা দিচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই আসন ছাড় মূলত কৌশলগত—কিছু আসনে ভোট বিভাজন ঠেকানো এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থী সংকট সামাল দিতেই এই সমঝোতা।
আদর্শের নির্বাচন নাকি হিসাবের নির্বাচন?
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যে জোট রাজনীতি দৃশ্যমান হচ্ছে, তা আদর্শিক ঐক্যের চেয়ে ক্ষমতার অঙ্কেই বেশি নির্ভরশীল। দল ভাঙা, বহিষ্কার, বিলুপ্তি কিংবা জোট বদলের ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে—এই নির্বাচন কেবল ভোটের লড়াই নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের এক নীরব যুদ্ধ। প্রশ্ন থেকে যায়, এই হিসাবের রাজনীতিতে ভোটারদের প্রত্যাশা কতটা জায়গা পাবে?


