
মহানবী (স) এর বংশের ১৪তম প্রতিনিধি ও বংশধর হযরত বড় পীর মুহিউদ্দিন আব্দুল কাদির জিলানি (র) বলেছেন, তোমার অস্তিত্ব বিলিন না হওয়া পর্যন্ত ওয়াজ করিও না। প্রথমে শরীয়তের আদেশ-নিষেধ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করে শক্তিশালী হও, তারপর দেখ উহার স্বাদময় আল্লাহর নৈকট্য ও রহস্য কত আনন্দ ও সুন্দর। এই বাণী প্রদানের পূর্বে হযরত বড় পীর (র) এর জীবনে একটি বিশেষ অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। তিনি তখন মুসলিম জাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক, মুহাদ্দিস, ফিকাহ শাস্ত্রবিদ তথা সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী মহাপুরুষ। তখন তিনি সর্বক্ষণ নীরব থাকতেন। কি যেন ভাবতেন। তখন বাগদাদের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাঁকে হেড মুদারিসের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য পীড়াপীড়ি করত। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন ওয়াজ মাহফিলে ওয়াজ করার জন্য অনুনয় বিনয় করত। কিন্তু তিনি ছিলেন নীরব।
এ সময় মুসলিম জাহানের অবস্থা ছিল বড়ই করুণ। হঠাৎ একদিন একটি অচেনা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত কঙ্কালসার এক ব্যক্তি হযরত বড় পীর (র) এর সম্মুখে পড়ে কাতরাচ্ছিলেন। লোকটি আর্তনাত করে তাঁকে বলছিলেন, হুজুর, আমি একটি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান— হয়ে আছি, আপনি দয়া করে আমাকে একটু স্পর্শ করুন, আপনি স্পর্শ করলে আমার এই দুরাােগ্য ব্যাধি ভালো হয়ে যাবে; হুজুর, আমার প্রতি দয়া করুন, আমার প্রতি একটু করুণা করুন। লোকটির কাতরতায় হযরত বড় পীর (র) ভাবলেন লোকটি হয়তো পাগল, তা’না হলে এরকম উদ্ভট কথা বলে, আমি তাকে স্পর্শ করলেই তার দুরারোগ্য ব্যাধি ভাল হয়ে যাবে! এরকম সাত পাঁচ ভেবে হযরত বড় পীর (র) চলে যেত উদ্যত হলে লোকটি হযরত বড় পীরের পথ আগলে ধরে বলেন, ‘হুজুর, আল্লাহর ওয়াস্তে আমার প্রতি দয়া করুন’। আল্লাহর ওয়াস্তে তথা আল্লাহর দোহাই দেওয়াতে হযরত বড় পীর থমকে দাঁড়ান। তিনি লোকটিকে দাঁড় করানোর উদ্দেশ্যে তার একটি হাত ধরেন। হযরত বড় পীর লোকটির হাত ধরামাত্রই তার শরীর অস্বাভাবিভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে, মুহুর্তের মধ্যে লোকটি একজন যুবকে পরিণত হয়। তখন আকাশে বাতাসে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হতে থাকে ‘মুহিউদ্দিন, মুহিউদ্দিন’। অর্থ : হে ধর্মের পুণর্জন্মদানকারী, হে ধর্মের পুণর্জন্মদানকারী।
অলৌকিকভাবে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় হযরত বড় পীর (র) চিন্তামগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি ওই ঘটনার মর্মার্থ নিয়ে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হন। ভাবতে ভাবতে এক সময় তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তন্দ্রাবস্থায় তিনি দেখেন তাঁর ঘর ঐশ্বরিক আলোয় আলোকিত হয়ে গেছে। মহানবী রসূলে করিম (স) তাঁর কাছে আগমন করেছেন। নবীজি তাকে বলছেন, হে আমার প্রিয় আব্দুল কাদির, আপনি নীরব কেন? আমার দীন ইসলামের এই করুণ অবস্থার মধ্যে আপনি চুপ করে আছেন কেন? আল্লাহ-রসূল সম্পর্কে মানব জাতিকে সচেতন করে তুলুন। আমার দীন ইসলাম এখন ওই কঙ্কালসার মানুষটির মত হয়ে গেছে। যে মানুষটি আপনার স্পর্শে যুবকে পরিণত হয়েছে। আপনি আর চুপ করে থাকবেন না।
মহানবী রসূলে করিম (স) এর ওই পবিত্র বাণী শুনে হযরত বড় পীর হাতজোড় করে হাটুভেঙ্গে বসে নবীজিকে বললেন, ইয়া রসূলুল্লাহ, ইয়া হাবিবুল্লাহ (স), মহান আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের হাকিকত কি যথাযথ আদবরক্ষা করে কোনো মানুষ বয়ান করতে পারে? কোন্ বাক্য কত বিনয়ের সাথে নিম্নস্বরে বলতে হবে আর কোন্ বাক্য কত উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতে হবে তা কিভাবে আমি রক্ষা করব? কোনো একটি বাক্য যদি আমি উচ্চস্বরে বলে বে-আদবী করে ফেলি, শুধুমাত্র এই ভয়ে আমি চুপ করে আছি। ইয়া রসূলুল্লাহ (স), দয়া করে আমাকে ক্ষমা করুন।
হযরত বড় পীরের ওই মিনতি শুনে মহানবী রসূলে করিম (স) সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, আপনি হাঁ করুন। সঙ্গে সঙ্গে বড় পীর হাঁ করলেন। তখন মহানবী (স) বড় পীরের মুখে ফুঁক দিয়ে বললেন, এখন থেকে আপনার জবান থেকে যে বাক্য উচ্চারিত হবে তা আপনার জবানের বাক্য হবে না, তা সম্পূর্ণই আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের জবানে বলা হবে। মহান আল্লাহ ও আল্লাহর রসূল আপনার জবানে কথা বলবেন। এ ঘটনার পর হযরত বড় পীর (র) ওয়াজ শুরু করেন। জিন, ফিরিস্তা, রাজা-বাদশা, আমির-ওমরাহগণ ছব্ধবেশ ধারণ করে মাহফিল প্রাঙ্গণে সাধারণ মানুষের মধ্যে একাকার হয়ে হযরত বড় পীর (র) ওয়াজ শ্রবণ করতেন। ওই আদব-আখলাকের মধ্য দিয়ে আল্লাহ ও আল্লাহর রসূল (স) এর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে আত্মশক্তি অর্জন করার শিক্ষা-দীক্ষা বর্তমানের আলেম-উলামাদের মধ্যে কোথায়? খিলাফতীয় আকিদার শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রচলিত থাকার কারণেই ওই শিক্ষা আমাদের মধ্যে নেই।
সুফি সাগর সামস্
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি-বিএইচপি।


